عَنْ مَالِك أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا كِتَابَ اللهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ
মালিক ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আমি তোমাদের মাঝে দুইটি জিনিস (আদেশনামা) রেখে গেলাম। যতদিন তোমরা এ দুইটি জিনিস আঁকড়ে ধরে থাকবে ততদিন তোমরা কখনোই পথভ্রষ্ট হবে না। একটি আল্লাহর কিতাব এবং অপরটি তাঁর নবির সুন্নাত।”
হে নবি! বলে দাও, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো তাহলে আমাকে অনুসরণ করো, তবে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ মাফ করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সুরা আলে ইমরান ৩:৩১)
রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তোমাদের মধ্যে যারা আমার পরে বেঁচে থাকবে তারা অনেক মতবিরোধ দেখতে পাবে। এক্ষেত্রে তোমাদের উপর দায়িত্ব আমার সুন্নাত ও সুপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাত অনুসরণ করা। তোমরা দৃঢ়ভাবে তা আঁকড়ে ধরবে, কোনো প্রকারেই তার বাইরে যাবে না। আর তোমরা (আমার ও খুলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাতের বাইরে) নতুন উদ্ভাবিত সকল বিষয় সর্বতোভাবে পরিহার করবে; কারণ সকল নতুন উদ্ভাবিত বিষয়ই বিদআত এবং সকল বিদআতই বিভ্রান্তি ও পথভ্রষ্টতা।”১(খুতবাতুল ইসলাম, পৃষ্ঠা ৪১৫)
জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। মক্কা বিজয়ের বছর রমজান মাসে রোজা অবস্থায় রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। যখন তিনি কুরাউল গামিম নামক স্থানে পৌঁছলেন, তখন লোকেরাও রোজা ছিল। এরপর তিনি একটি পানির পাত্র নিয়ে আসতে বললেন, এরপর পাত্রটি উপরে তুলে ধরলেন যেন লোকেরা তাঁর দিকে দেখে। অতঃপর তিনি পানি পান করলেন। তখন তাঁকে বলা হলো, এখনও কিছু লোক রোজা অবস্থায় আছে। তিনি বললেন: তারা অবাধ্য, তারা অবাধ্য।
রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরাবস্থায় ফজরের দুই রাকাত সুন্নাত আদায় করতেন। কিন্তু অন্যান্য সুন্নাতে মুয়াক্কাদা আদায় করতেন না। (তিনি সফর অবস্থায় তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতেন।) যেহেতু প্রয়োজন ও উপকরণ থাকা সত্ত্বেও তিনি সুন্নাতে মুয়াক্কাদা বর্জন করেছেন। কাজেই বর্জন করাই সুন্নাত, পালন করা সুন্নাত নয়। (এহ্ইয়াউস সুনান, পৃষ্ঠা ৯২)
আবিস ইবনে রাবিয়া উমর ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন। তিনি (উমর ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু) হাজরে আসওয়াদের কাছে এসে তাকে চুমু দিয়ে বললেন: আমি জানি তুমি একটি পাথর বৈ কিছু নও। তুমি কারো ক্ষতি করতে পার না, আবার উপকারও করতে পার না। আমি যদি নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তোমাকে চুমু দিতে না দেখতাম তাহলে তোমাকে চুমু দিতাম না।
তাবেয়ি উরওয়া অন্য এক তাবেয়ি মুয়াবিয়া ইবনে কুররা থেকে বর্ণনা করেন যে, তার আব্বা সাহাবি কুররা ইবনে ইয়াস বলেছেন: যখন আমি রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বাইয়াত করলাম, তখন তাঁর জামার বোতাম খোলা ছিলো। উরওয়া বলেন, আমি শীত হোক বা গ্রীষ্ম হোক কখনই এই সাহাবি কুররা বা তার পুত্র মুয়াবিয়াকে জামার বোতাম লাগানো অবস্থায় পাই নি। সর্বদাই তারা জামার বোতাম খুলে রাখতেন। (সুনান ইবনে মাজাহ ৩৫৭৮)
সুবহানাল্লাহ! দেখুন রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি সাহাবিদের ভালোবাসা, ভক্তি ও অনুসরণের নমুনা। কোনো প্রশ্ন নয়, কোনো যুক্তি নয় শুধু তাঁর অনুসরণের আগ্রহ। রাসুল ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেছেন, আমি করবো। রাসুল ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেন নি, আমিও করবো না। (এহ্ইয়াউস সুনান, পৃষ্ঠা ৭৭)
আনাস ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি আবু তালহা (আনসারি) ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর ঘরে লোকদেরকে মদ পান করাচ্ছিলাম, তখনই মদের নিষেধাজ্ঞা অবতীর্ণ হলো। রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন ঘোষককে তা প্রচারের নির্দেশ দিলে সে তা ঘোষণা করল। আবু তালহা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন: বেরিয়ে দেখো তো শব্দ কিসের? আনাস ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: আমি বাইরে গেলাম এবং বললাম যে, একজন ঘোষক ঘোষণা দিচ্ছে যে, মনে রেখো মদ হারাম করে দেওয়া হয়েছে। এরপর তিনি আমাকে বললেন: যাও, এগুলো রাস্তায় ঢেলে দাও। আনাস ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: সেদিন মদিনায় রাস্তায় রাস্তায় মদের স্রোত প্রবাহিত হয়েছিল।
আনাস ইবনে মালিক ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: তিন জনের একটি দল নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইবাদত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য নবি ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের গৃহে আসলো। যখন তাদেরকে এ সম্পর্কে জানানো হলো তখন তারা ইবাদতের পরিমাণ কম মনে করল এবং বলল: নবি ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমাদের তুলনা হতে পারে না। কারণ তাঁর আগের ও পরের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। তাদের একজন বলল: আমি সারা জীবন রাতভর নামাজ পড়বো। আর একজন বলল: আমি সারা বছর রোজা রাখবো, কখনো বাদ দিবো না। শেষের জন বলল: আমি নারী সঙ্গ ত্যাগ করবো, কখনো বিয়ে করবো না। অতঃপর রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে আসলেন এবং বললেন, “তোমরা কি ঐসব লোক যারা এমন এমন কথাবার্তা বলেছ? আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং তোমাদের চেয়ে তাঁর প্রতি বেশি অনুগত। অথচ আমি রোজা রাখি এবং তা থেকে বিরত থাকি, আমি নামাজ পড়ি ও ঘুমাই এবং মেয়েদেরকে বিয়ে করি (এ হচ্ছে আমার সুন্নাত)। অতএব যারা আমার সুন্নাত মেনে চলে না, তারা আমার উম্মত নয়।”
প্রসিদ্ধ তাবে-তাবেয়ি সুফিয়ান সাওরি ﵀রহিমাহুল্লাহ বলেন, কাজ ছাড়া কথার মূল্য নেই। বিশুদ্ধ নিয়ত ছাড়া কথা ও কাজের কোনো মূল্য নেই। আর সুন্নাতের অনুসরণে না হলে কথা, কাজ ও নিয়ত কোনো কিছুরই মূল্য নেই। (এহ্ইয়াউস সুনান, পৃষ্ঠা ১০৪)
আনাস ইবনে মালিক ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, “হে বৎস, সকাল-সন্ধ্যা (সবসময়) কারো অমঙ্গল চিন্তা না করে যদি থাকতে পার তবে তা-ই করো।” অতঃপর তিনি বললেন, “হে বৎস, এটাই আমার সুন্নাত। আর যে ব্যক্তি আমার সুন্নাতকে জিন্দা করল সে আমাকে ভালোবাসল, আর যে আমাকে ভালোবাসল সে জান্নাতে আমার সাথি হবে।”
জামি আত-তিরমিজি ২৬৭৭ থেকে: নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমার সুন্নাতের মধ্য থেকে এমন কোনো একটি সুন্নাতকে জিন্দা করবে যা আমার পর বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল, তবে তার জন্য সেই পরিমাণ সওয়াব রয়েছে যে পরিমাণ সওয়াব এর উপর আমলকারীগণ পাবে। অথচ আমলকারীদের সওয়াবে কোনো ঘাটতি হবে না। আর যে ব্যক্তি কোনো ভ্রষ্ট বিদআত (গোমরাহির নতুন পথ) চালু করে যাতে আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল সন্তুষ্ট নন তবে সেজন্য তার সেই পরিমাণ গুনাহ হবে যে পরিমাণ গুনাহ এর উপর আমলকারীদের হবে। অথচ এতে আমলকারীদের গুনাহ কিছুমাত্র কমবে না।”
মুজাদ্দিদে আলফে সানি ﵀রহিমাহুল্লাহ বলেন যে, ছোট বড়, সামান্য ক্ষুদ্র, যেকোনো মৃত সুন্নাতকে পুনরুজ্জীবিত করা বা প্রচলন করাই তার একমাত্র স্বপ্ন-সাধনা। (এহ্ইয়াউস সুনান, পৃষ্ঠা ১৬৮)
কুরআন ও হাদিস থেকে জানতে পারি, রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঠিক অনুসরণ করলে আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়া যাবে। সুন্নাত পুনরুজ্জীবিত করলে রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভালোবাসা পাওয়া যাবে এবং জান্নাতে তাঁর সাথি হওয়া যাবে। আর পুনরুজ্জীবিত করা হাদিসটি যারা আমল করবে তাদের সমান নেকি পাওয়া যাবে। এই অভাবনীয় পুরস্কারের আশায় যেখানে সুন্নাতসম্মত আমল হচ্ছে না সেখানে সুন্নাতসম্মত আমল চালু করার চেষ্টা করি ও আল্লাহর তাওফিক কামনা করি।