মতভেদ

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْأَمْرُ ثَلَاثَةٌ أَمْرٌ بَيِّنٌ رُشْدُهُ فَاتَّبِعْهُ وَأَمْرٌ بَيِّنٌ غَيُّهُ فَاجْتَنِبْهُ وَأَمْرٌ اخْتُلِفَ فِيهِ فَكِلْهُ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجل

ইবনে আব্বাস ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “শরিয়তের বিষয়সমূহ তিন ধরনের। এক ধরনের বিষয় হলো: যার সঠিক হওয়া একেবারেই স্পষ্ট, অতএব তা মেনে চল। আর এক ধরনের বিষয় হলো: যার ভ্রান্ত হওয়া একেবারেই স্পষ্ট, অতএব তা বর্জন করো। আর কিছু বিষয় আছে যে সম্পর্কে মতভেদ (ইখতিলাফ) রয়েছে, অতএব সেগুলি আল্লাহর উপর ছেড়ে দিবে।”

ইসলামে ব্যাখ্যা বিষয়ক মতভেদ দু’রকম:

(১) ইখতেলাফ (মতপার্থক্য): ইখতেলাফের ক্ষেত্রে প্রত্যেকে নিজ মতকে অগ্রাধিকার দেন তবে অন্যের মতকেও স্বীকার করেন। ইখতেলাফের ভিত্তি: ইলম বা জ্ঞান ও দলিল। ইখতিলাফকারীদের মধ্যে ইখলাস থাকে। তাঁদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসা থাকে। সাহাবায়ে কেরাম থেকেই ইখতিলাফ চলে আসছে এবং তা বৈধ।

(২) ইফতিরাক (বিচ্ছিন্ন হওয়া): এক্ষেত্রে ইফতিরাককারীগণ (মতভেদকারীগণ) নিজ মতকে ‘হক’ ও অন্যের মতকে ‘বাতিল’ মনে করেন। ইফতিরাকের ভিত্তি: ব্যক্তিগত পছন্দ বা প্রবৃত্তির অনুসরণ, জিদ ও ইখলাসের অনুপস্থিতি। ইফতিরাককারীরা অন্য পক্ষের ব্যক্তিদের সাথে হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণ করে। ইফতিরাক অবৈধ। ইসলামের বৃহত্তর স্বার্থে ইখতিলাফকারীগণ ঐক্যবদ্ধ হন। কিন্তু ইফতিরাককারীগণ বিচ্ছিন্নতার পক্ষে অবস্থান নেয়। (ইসলামী আকীদা, পৃষ্ঠা ৬০৭‑এর বর্ণনার আলোকে)

عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَنَا لَمَّا رَجَعَ مِنَ الْأَحْزَابِ لاَ يُصَلِّيَنَّ أَحَدٌ الْعَصْرَ إِلَّا فِي بَنِي قُرَيْظَةَ فَأَدْرَكَ بَعْضَهُمُ الْعَصْرُ فِي الطَّرِيقِ فَقَالَ بَعْضُهُمْ لاَ نُصَلِّي حَتَّى نَأْتِيَهَا وَقَالَ بَعْضُهُمْ بَلْ نُصَلِّي لَمْ يُرَدْ مِنَّا ذَلِكَ فَذُكِرَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَمْ يُعَنِّفْ وَاحِدًا مِنْهُمْ

ইবনে উমর ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহযাব যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার সময় আমাদের বললেন, “বনু কুরায়যার মধ্যে পৌঁছার পূর্বে কেউ আসরের নামাজ আদায় করবে না।” কিন্তু পথেই আসরের ওয়াক্ত হয়ে গেলে তাদের কেউ কেউ বললেন: আমরা সেখানে না পৌঁছে (আসরের) নামাজ আদায় করব না; আবার কেউ কেউ বললেন: আমরা নামাজ আদায় করে নেব। কেননা নিষেধ করার উদ্দেশ্য এটা ছিলনা (যে আমরা নামাজ কাজা করব)। নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট একথা উল্লেখ করা হলে তিনি তাদের কাউকেই ভর্ৎসনা করেন নি।

এ হাদিস থেকে স্পষ্ট যে, আল্লাহর রাসুল ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশের অর্থ যদি (ইসলাম অভিজ্ঞ) বিভিন্ন জন বিভিন্ন রূপে বুঝে থাকে এবং সে অনুযায়ী আমল করে তবে তা দোষ নয়। কারণ সকলেই রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনুগত্য মনে করেই তা করে থাকে। তাই রাসুল ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদিস বুঝার ব্যাপারে যে মতপার্থক্য দেখা যায় তা খোলা মনে মেনে নেয়াই ভালো। এ নিয়ে দলাদলি করা জায়েজ নয়।

عَنْ أَبِي أُمَامَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا ضَلَّ قَوْمٌ بَعْدَ هُدًى كَانُوا عَلَيْهِ إِلَّا أُوتُوا الْجَدَلَ ثُمَّ تَلَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ هَذِهِ الآيَةَ مَا ضَرَبُوهُ لَكَ إِلَّا جَدَلًا بَلْ هُمْ قَوْمٌ خَصِمُونَ

আবু উমামা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কোনো কওমই হেদায়েত লাভের পর গোমরাহ হয় নি, কিন্তু যখন তারা (ধর্মীয়) বিতর্কে লিপ্ত হয়েছে (তখনই গোমরাহ হয়েছে)।” অতঃপর রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াত পড়লেন, “তারা তোমার কাছে শুধু বিতর্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই তা পেশ করেছে। আসলে তারা বাক-বিতণ্ডাকারী লোক।” (সুরা আজ-জুখরুফ ৪৩:৫৮)

আল্লাহ ইমানদারদের ঐক্যবদ্ধ হতে বলেছেন অথচ তারা মুস্তাহাব বা মাকরুহ পর্যায়ের বিষয় নিয়ে বিতর্ক করছে এবং জিদের বশবর্তী হয়ে বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। চিন্তা করে দেখুন, বিতর্কের বিষয় হচ্ছে মোস্তাহাব পর্যায়ের আর বাক-বিতণ্ডা করা বা বিচ্ছিন্ন হওয়া হচ্ছে হারাম পর্যায়ের। দীন সম্পর্কে আমাদের চেতনার এ এক করুণ অবস্থা!

বিষয়বস্তুতে যান

যোগাযোগ

মতামত, সংশোধনী বা যে কোনো পরামর্শ জানাতে এই ফর্মটি ব্যবহার করুন।