আব্দুল্লাহ ইবনে উমর ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবনের শেষ দিকে আমাদের নিয়ে ইশার সালাত আদায় করলেন। সালাম ফেরানোর পর তিনি দাঁড়িয়ে বললেন: তোমরা কি এ রাত সম্পর্কে জানো? আজ যারা পৃথিবীতে রয়েছে, একশ বছরের মাথায় তাদের কেউ আর অবশিষ্ট থাকবে না।
শাদ্দাদ বিন আউস ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “প্রকৃত বুদ্ধিমান সেই লোক যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য কাজ করে। আর নির্বোধ ও অক্ষম সেই লোক যে নিজেকে নফসের (প্রবৃত্তি) হাতে ছেড়ে দিয়েছে অথচ আল্লাহর কাছ থেকে কিছু পাবার আকাঙ্ক্ষা করছে।”
আব্দুল্লাহ ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: একদা রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাটাইয়ের উপর শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুম থেকে ওঠার পর আমরা তাঁর শরীরে চাটাইয়ের দাগ দেখে বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমরা যদি আপনার জন্য একটা তোষক বানিয়ে দিতাম। তিনি বললেন, “দুনিয়ার সাথে আমার কী সম্পর্ক? দুনিয়ায় তো আমি সেই সওয়ারীর মতো যে পথ চলতে চলতে কোনো গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিল এবং কিছু সময় পর গাছকে ছেড়ে দিয়ে চলতে শুরু করল।”
ফেরাউন ও তার বাহিনীকে ডুবিয়ে মারা হলো। আল্লাহ বলেন, “কতই না বাগ-বাগিচা, ঝরনা, ফসলাদি, সুরম্য প্রাসাদ, যা তারা ছেড়ে গিয়েছে। কতই না ভোগ-বিলাসের সামগ্রী যাতে তারা আনন্দ-ফুর্তি করত তা সবই ফেলে গেল।” (সুরা আদ-দুখান ৪৪:২৫-২৭)
সাহল ইবনে সাদ আস-সাইদি ﵄রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমার খন্দকের যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি (মাটি) খনন করছিলেন এবং আমরা মাটি সরিয়ে দিচ্ছিলাম। তিনি আমাদের দেখছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, “হে আল্লাহ, আখেরাতের সুখ ছাড়া কোনো সুখ নেই। কাজেই তুমি আনসার ও মুহাজিরদেরকে ক্ষমা করে দাও।”
এখানে লক্ষণীয় যে, পরিখা খনন করার সময় সাহাবায়ে কেরাম ক্ষুধার্ত ছিলেন অথচ নবি ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্ষুধা ও কষ্ট দেখেও দুনিয়ার সুখ-শান্তির জন্য নয় বরং পরকালীন সুখ-শান্তির জন্য দোয়া করেছেন।
আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “দুনিয়া মুমিনদের জন্য কারাগার এবং কাফিরদের জন্য জান্নাত।”
মুস্তাওরিদ ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহর কসম! দুনিয়া আখিরাতের তুলনায় এরূপ যেমন তোমাদের কেউ তার এই আঙ্গুল (বর্ণনাকারী ইয়াহইয়া অনামিকা আঙ্গুলের দিকে ইশারা করলেন) সমুদ্রে ডুবিয়ে বের করে এনে দেখুক তার আঙ্গুল কতটুকু (পানি) নিয়ে ফিরেছে।”
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: একবার রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাঁধ ধরে বললেন, “তুমি দুনিয়াতে এমনভাবে থাকো যেন তুমি একজন প্রবাসী অথবা পথচারী (পথিক)।” আর ইবনে উমর ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, তুমি সন্ধ্যায় উপনীত হলে সকালের অপেক্ষা কোরো না এবং সকালে উপনীত হলে সন্ধ্যার অপেক্ষা কোরো না। তোমার সুস্থতার সময় তোমার পীড়িত অবস্থার জন্য প্রস্তুতি নাও। আর তোমার জীবিত অবস্থায় তোমার মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নাও।
হাশরের দিন মানুষ আফসোস করবে। “সে বলবে, হায়! আমি যদি আমার এ (পরকালীন) জীবনের জন্য আগে (দুনিয়ায়) থাকতে কিছু (ভালো আমল) পাঠাতাম।” (সুরা আল-ফজর ৮৯:২৪)
আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে লোক তার ভাইয়ের সম্মানহানী বা অন্য কোনো ব্যাপারে জুলুমের জন্য দায়ী, সে যেন (এ দুনিয়ায়ই) তার কাছে মাফ চেয়ে নেয় সেই দিন আসার পূর্বে যেদিন দিনার-দিরহাম (টাকা-পয়সা) বলতে তার কিছুই থাকবে না। বরং যদি তার কোনো নেক আমল থাকে তবে জুলুম মোতাবেক তা থেকে কেটে নেওয়া হবে। আর কোনো নেক আমল না থাকলে মজলুমের পাপ থেকে কিছু নিয়ে তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হবে।”
সহিহ মুসলিমে এক ব্যক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে, কিয়ামতের দিন সে জান্নাতে যাওয়ার মতো নেকি নিয়ে যাবে কিন্তু সে যাদের প্রতি (গালি, গীবত, অর্থ আত্মসাৎ, অন্যায়ভাবে প্রহার ও হত্যা ইত্যাদি) জুলুম করেছিল তাদেরকে তার নেকি দেয়া হবে এবং নেকি ফুরিয়ে গেলে তাদের গুনাহ তার ঘাড়ে চাপিয়ে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। এই ব্যক্তিই সত্যিকার নিঃস্ব বা কাঙাল।১(মা’আরেফুল কোরআন, সুরা আজ-জুমারের ৩১ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা)
মুফতি মুহাম্মদ শফী (2010). মা’আরেফুল কোরআন. ১ম বাংলা সংস্করণ. ঢাকা, বাংলাদেশ: মাকতাবাতুল আযহার.