আয়িশা ﵂রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আল্লাহ প্রথম সারির মুহাজির মহিলাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন। কেননা আল্লাহ যখন এ আয়াত নাজিল করেন,
তারা যেন তাদের গলদেশ ও বক্ষদেশ মাথার কাপড় (ওড়না) দ্বারা আবৃত করে। (সুরা আন-নুর ২৪:৩১)
তখন তারা তাদের সেলাইবিহীন কাপড় ফেড়ে তা দিয়ে ওড়না বানিয়ে নেন।
সুরা আন-নুর ৩১-এর ব্যাখ্যা থেকে: মুখমণ্ডল আবৃত করা ফরজ কি না সে বিষয়ে মতভেদ থাকলেও তা আবৃত করা যে উত্তম ও সুন্নাত-সম্মত নেক কর্ম সে বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই। (বলা বাহুল্য, মুখমণ্ডল-ই সৌন্দর্য ও শোভার আসল কেন্দ্র।) ফিতনা বা সামাজিক অনাচারের ভয় থাকলে সবার মতেই মুখ ঢেকে রাখা ফরজ। তেমনিভাবে একান্ত প্রয়োজন হলে মুখ খোলার অনুমতিও সকলেই দিয়েছেন।
আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, “মহিলারা যেন তাদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদক্ষেপ না করে।” এ নির্দেশ অত্যন্ত সুস্পষ্টরূপে প্রমাণ করে যে, মুসলিম মহিলাকে পদযুগল আবৃত করতে হবে। (পোশাক, পর্দা ও দেহ-সজ্জা, পৃষ্ঠা ২৮৯)
রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে মহিলাদের হাতে মেহেদি না থাকলে তিনি আপত্তি করতেন। তার মানে মেহেদিসহ হাত খোলা থাকতো। মেহেদি না থাকলে তিনি রাগ করতেন। বলতেন, তোমার হাত পুরুষের মতো কেন? আবার আংটি পরা হাত রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখেছেন। দেখে আংটির যাকাত দিতে বলেছেন। এটা আমরা হাদিসে পাই। এজন্য আমরা আশা করি, মেয়েরা বোরকা পরে হাত বের করতে পারবেন। এতে গুনাহ হবে না। তবে ঢেকে রাখা ভালো। (জিজ্ঞাসা ও জবাব, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৪)
আবু উমামাহ ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “যে কোনো মুসলমানের দৃষ্টি কোনো স্ত্রীলোকের সৌন্দর্যের উপর পড়বে, অতঃপর সে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিবে, আল্লাহ তার ইবাদতে স্বাদ ও আনন্দ সৃষ্টি করে দিবেন।”
“তোমরা নবির স্ত্রীদের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। তোমাদের ও তাদের দিলের পবিত্রতা রক্ষার জন্য এটিই উত্তম পন্থা।” (সুরা আল-আহজাব ৩৩:৫৩)
এর ব্যাখ্যায় তাফহীমুল কুরআনে বলা হয়েছে, এই আয়াতকেই পর্দার আয়াত বলা হয়। এই নির্দেশ আসার পর হযরত -এর স্ত্রীদের ঘরের দরজায় পর্দা টানানো হয়। আর নবির ঘর যেহেতু সব মুসলমানের জন্য আদর্শ, ফলে সব মুসলমানের ঘরের দরজায় পর্দা টানানো হলো। এ মহান কিতাব স্ত্রীলোকদের (পর-পুরুষের) সামনা-সামনি ও মুখোমুখি হয়ে কথা বলতে নিষেধ করে। আর পর্দার অন্তরালে দাঁড়িয়ে কথা বলার যুক্তি ও প্রয়োজনীয়তা পেশ করে যে, তোমাদের ও তাদের দিলের পবিত্রতা রক্ষার জন্য এটি উপযুক্ত পন্থা।
উকবা বিন আমের ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “মেয়েদের নিকট গমন করা থেকে বেঁচে থাকো।” একজন আনসারি ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন: ইয়া রাসুলাল্লাহ, দেবরের ব্যাপারে আপনি কী বলেন? তিনি বললেন, “দেবর হচ্ছে মৃত্যু সদৃশ।”
স্ত্রীর জন্য স্বামীর সেই সব আত্মীয়ের ক্ষেত্রে এ হাদিস প্রযোজ্য নয় যারা মাহরাম। যে সব আত্মীয়ের সাথে কোনো মহিলার বিয়ে হারাম সেই সব আত্মীয় ঐ মহিলার জন্য মাহরাম। আর যাদের সাথে বিয়ে জায়েজ তারা “গায়ের মাহরাম।” মাহরাম আত্মীয়রা হচ্ছে দাদা, নানা, পিতা (সৎ পিতা, দুধ পিতাসহ) ভাই (সৎ ভাই, দুধ ভাইসহ), পুত্র, পৌত্র, নাতি, ভাইয়ের পুত্র, বোনের পুত্র, চাচা, মামা, শ্বশুর এবং জামাই। স্ত্রী “গায়ের মাহরাম” আত্মীয় (যেমন: দেবর, চাচাত দেবর ইত্যাদি)-এর সাথে খোলা-মেলা মিশবে না।
আবু মাসউদ ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “পূর্ববর্তী নবিদের শিক্ষা থেকে মানুষ যা পেয়েছে, তার একটি হলো, যদি তুমি লজ্জাই না করো, তবে তুমি যা ইচ্ছা তাই করো।”
ইবনে আব্বাস ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বললেন, “মাহরামের বিনা উপস্থিতিতে নারীর সাথে অন্য পুরুষ সাক্ষাৎ করবে না।” তখন এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল: ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার স্ত্রী হজ করার জন্য বেরিয়ে গেছে। আর অমুক অমুক যুদ্ধে যাওয়ার জন্য আমার নাম লেখা হয়েছে। তিনি বললেন, “ফিরে যাও এবং তোমার স্ত্রীর সঙ্গে হজ সম্পন্ন করো।”
উপরের ৩টি হাদিসের আলোকে দেখা যায়, লজ্জা ইমানের প্রমাণ। আবার কোনো স্ত্রী মাহরাম পুরুষ ছাড়া সফর করতে পারে না। সুরা আল-আহজাবের ৩২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “হে নবির স্ত্রীগণ, তোমরা সাধারণ মহিলাদের মতো নও। যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করে থাকো, তাহলে (পুরুষের সাথে) কোমল কণ্ঠে কথা বোলো না যাতে যার দিলে রোগ আছে, সে লোভ করবে বরং স্পষ্ট কথা বলো।”
সুতরাং উল্লিখিত আয়াত ও হাদিস আমলের জন্য আমাদের করণীয় হচ্ছে: যেসব কাজে মহিলাদেরকে পুরুষের উপর কর্তৃত্ব করতে হয় অথবা যেখানে প্রায়ই পরপুরুষের সাথে কথা বলতে ও মতবিনিময় করতে হয়, সেইসব কাজ থেকে মুসলিম মহিলাদের যথাসাধ্য দূরে থাকার চেষ্টা করা।
“নারীকে জনপ্রতিনিধির (পুরুষ ও নারী ভোটারের দ্বারা নির্বাচিত) দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে হলে তাকে অবশ্যই ভিন্ন পুরুষের সাথে অবাধ মেলা-মেশা করতে হবে। আরও গভীরভাবে নারীর প্রতিনিধি হওয়ার পরিণাম চিন্তা ও বিবেচনা করলে দেখা যাবে যে, এর ক্ষতি ব্যাপক এবং অত্যন্ত ভয়াবহ। নারী যদি প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব পালন করতে চায় তাহলে প্রথমত: তাকে তার ঘর-বাড়ি, শিশু-সন্তান ছেড়ে বাইরে যেতে হবে। এর ফলে অবহেলিত ঘর-বাড়ি ও সন্তান-স্বামীর সঙ্গে অন্তর-মনের দূরত্ব এক স্থায়ী ভাঙ্গনের সৃষ্টি করতে পারে। বস্তুত নারীকে স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক তৎপরতায় যোগদান করতে দিলে পারিবারিক জীবনে যে ভাঙ্গন ও বিপর্যয় দেখা দেবেই তাতে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না। নারীর পক্ষে এ কাজ করা অবাঞ্ছনীয় হয়ে পড়ে তখনি, যখন নারী হয় যুবতী ও সুন্দরী।” (পরিবার ও পারিবারিক জীবন, পৃষ্ঠা ৩১২)