আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তার নাক ধূলিমলিন হোক (অর্থাৎ সে লাঞ্ছনার যোগ্য), তার নাক ধূলিমলিন হোক, তার নাক ধূলিমলিন হোক।” (সাহাবিরা) জিজ্ঞেস করলেন: হে আল্লাহর রাসুল ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ! সে কে? উত্তরে তিনি বললেন, “যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতার কোনো একজনকে বা উভয়কে বার্ধক্য অবস্থায় পেয়েও (তাদের খেদমত করে) জান্নাতে যেতে পারল না।”
রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে পিতা-মাতার আনুগত্য করে, তার জন্য জান্নাতের দুইটা দরজা খোলা থাকবে এবং যে ব্যক্তি তাদের অবাধ্য হবে, তার জন্য জাহান্নামের দুইটি দরজা খোলা থাকবে। যদি পিতা-মাতার মধ্য থেকে একজন হয়, তবে জান্নাত অথবা জাহান্নামের একটি দরজা খোলা থাকবে।” এক ব্যক্তি প্রশ্ন করল: জাহান্নামের এই শাস্তির বাণী কি তখনও প্রযোজ্য হবে যখন পিতা-মাতা সন্তানের উপর জুলুম করবে? তিনি তিন বার বললেন, “যদি পিতা-মাতা সন্তানের উপর জুলুমও করে তবুও পিতা-মাতার অবাধ্যতার কারণে সন্তান জাহান্নামে যাবে।”১ এর সারমর্ম এই যে, পিতা-মাতার ব্যাপারে প্রতিশোধ নেয়ার অধিকার সন্তানের নেই। তারা জুলুম করলেও সন্তান সেবা-যত্ন ও আনুগত্য থেকে হাত গুটিয়ে নিতে পারে না। (মা’আরেফুল কোরআন, সুরা বনি ইসরাইলের ২৩ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা)
সন্তানের ধনসম্পদে পিতামাতার এ অধিকার কেবল সন্তানের মৃত্যুর পর মিরাস হিসেবেই নয়; বরং তার জীবদ্দশায়-ই এ অধিকার স্বীকৃত। রাসূলে করীম (ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেছেন: সন্তান পিতার অতি উত্তম উপার্জন বিশেষ, অতএব তোমরা—পিতামাতার—সন্তানদের ধনসম্পদ থেকে পূর্ণ স্বাদ গ্রহণ সহকারে পানাহার করো।
এক ব্যক্তি রাসূলের কাছে উপস্থিত হয়ে বললো: ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমার মাল-সম্পদ রয়েছে আর সন্তান-সন্ততিও আছে। কিন্তু এমতাবস্থায় আমার বাবা আমার মাল নিতে চায়, এ সম্পর্কে আপনার কি রায়? রাসূলে করীম (ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: তুমি আর তোমার মাল-সম্পদ সবই তোমার বাবার।২(পরিবার ও পারিবারিক জীবন, পৃষ্ঠা ৩৫৭)
আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমরা তোমাদের প্রকৃত বাপ-দাদার পরিচয় অস্বীকার কোরো না। কেননা যে ব্যক্তি পিতার পরিচয় দিতে অস্বীকৃতি জানালো, সে অবশ্যই কাফিরদের মতো আচরণ করল।”
আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসুল! আমার কাছে সদ্ব্যবহার পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার কে? তিনি বললেন, “তোমার মা।” সে বলল: এরপর কে? তিনি বললেন, “তোমার মা।” সে পুনরায় বলল: এরপর কে? তিনি বললেন, “তোমার মা।” পুনরায় সে বলল: এরপর কে? তিনি এবার বললেন, “তারপর তোমার বাপ।”
পিতার চাইতে মায়ের হক এ কারণে বেশি যে, মা সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেছে, স্তন্য দান করেছে ও প্রতিপালন করেছে।
সহিহ মুসলিম ২৫৫০/৮-এর বর্ণনা থেকে: জুরাইজ ছিলেন একজন ইবাদতগুজার ব্যক্তি। তিনি তাঁর ইবাদতখানায় সলাতে মশগুল থাকা অবস্থায় তাঁর মা এসে ডাকলেন: হে জুরাইজ! জুরাইজ মনে মনে বললেন: হে আমার রব! একদিকে আমার মা, অন্যদিকে আমার সলাত। তিনি সলাতেই মশগুল থাকলেন। মা ফিরে গেলেন। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দিনে তাঁর মা তাঁকে একই অবস্থায় পেলেন। এবার তাঁর মা বললেন: হে আল্লাহ! বদকার স্ত্রীলোকের মুখ দেখার আগে তার মৃত্যু দিও না। বনি ইসরাইলের এক সুন্দরী স্ত্রীলোক নিজেকে জুরাইজের সামনে পেশ করে। কিন্তু জুরাইজ তার প্রতি ভ্রুক্ষেপও করেন নি। অবশেষে স্ত্রীলোকটি সেখানে এক মেষ রাখালের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে গর্ভবতী হয়। যখন সে সন্তান প্রসব করল তখন সে লোকদেরকে বলল: এ সন্তান জুরাইজের। ফলে লোকেরা জুরাইজের কাছে এসে তাঁর ইবাদতখানা ভেঙে দিলো এবং তাঁকে প্রহার করল। তিনি বললেন: ব্যাপার কী? তারা ঘটনা বললে তিনি জিজ্ঞেস করলেন যে, শিশুটি কোথায়। তারা শিশুটিকে নিয়ে আসলে তিনি সলাত আদায় করে শিশুটির পেটে টোকা দিয়ে বললেন: হে বৎস! তোমার পিতা কে? শিশুটি উত্তর দিল: অমুক রাখাল। তখন লোকেরা জুরাইজকে চুমু খেতে লাগল এবং বলল: আপনার ইবাদতখানা স্বর্ণ দ্বারা তৈরি করে দিব। তিনি বললেন: না, বরং পুনরায় মাটি তৈরি করে দাও, যেমন ছিল। লোকেরা তাই করল।
শিক্ষণীয় বিষয়: (১) প্রয়োজনে নফল ইবাদত ছেড়ে দিয়ে মায়ের আনুগত্য করতে হবে। (২) পিতা-মাতা যেন অসন্তুষ্ট হয়ে কখনো সন্তানের জন্য বদদোয়া না করেন। (৩) সন্তান মায়ের সাথে সুন্দর আচরণ করবে এবং মা সামান্য কষ্ট পায় এমন আচরণ করা থেকে বিরত থাকবে। (দেখুন: সুরা বনি ইসরাইল ১৭:২৩-২৪; সুরা লুকমান ৩১:১৩-১৫)
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: এক ব্যক্তি নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি চাইলো। তিনি বললেন, “তোমার মাতা-পিতা কি জীবিত আছেন?” সে বলল: হাঁ। তিনি বললেন, “তাদের খেদমত করে সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করো।”
আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “জান্নাতে কোনো কোনো ব্যক্তির মর্যাদা বৃদ্ধি করা হবে। তখন সে বলবে, কীভাবে আমার মর্যাদা বৃদ্ধি পেলো? তখন তাকে বলা হবে, তোমার সন্তান তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছে। এজন্য তোমার মর্যাদা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।”৪(রাহে বেলায়াত, পৃষ্ঠা ১১৫))
আয়িশা ﵂রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। এক ব্যক্তি নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলল: আমার মা হঠাৎ ইন্তেকাল করেছেন। আর আমার মনে হচ্ছে, তিনি কথা বলতে পারলে দান করতেন। এ অবস্থায় আমি যদি তার পক্ষ থেকে দান করি তাহলে কি তিনি সওয়াব পাবেন? তিনি বললেন, “হাঁ।”
সহিহ আল-বুখারি ২৭৫৬ থেকে: ইবনে আব্বাস ﵄রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত। সাদ ইবনে উবাদা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর মা যখন মারা যান তখন তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। পরে তিনি বললেন: ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমার মা আমার অনুপস্থিতিতে মারা যান। আমি যদি তাঁর পক্ষ থেকে কিছু সদাকাহ (দান) করি তাহলে কি তা তাঁর কোনো উপকারে আসবে। তিনি বললেন, “হ্যাঁ।” সাদ ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন: তাহলে আমি আপনাকে সাক্ষী রাখছি, আমার ‘মিখরাফ’ নামক বাগানটি তাঁর জন্য সদাকাহ করে দিলাম।”
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কবিরা গুনাহগুলোর মধ্যে সবচাইতে বড় গুনাহ হলো- কোনো ব্যক্তির তার পিতা-মাতার প্রতি লানত করা।” জিজ্ঞেস করা হলো: হে আল্লাহর রাসুল! কিভাবে এক ব্যক্তি পিতা-মাতার উপর লানত করতে পারে? তিনি উত্তরে বললেন, “একজন অপরজনের বাপকে গালি দেয়, সেও ঐ ব্যক্তির বাপকে গালি দেয়। আর যখন ঐ ব্যক্তি তার মাকে গালি দেয় তখন সেও ঐ ব্যক্তির মাকে গালি দেয়।”
সালমান ইবনে আমের আযযাব্বি ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, “ছেলের আকিকা করা আবশ্যক। সুতরাং তার পক্ষ থেকে তোমরা রক্ত প্রবাহিত করো অর্থাৎ জন্তু জবেহ করো এবং তার মাথার চুল কেটে ফেল।”
আবু দারদা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “নিশ্চয় তোমাদেরকে কিয়ামতের দিন তোমাদের নাম এবং তোমাদের পিতার নাম ধরে ডাকা হবে। অতএব তোমরা তোমাদের ভালো নাম রাখো।”
আয়িশা ﵂রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: এক বেদুইন নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল: আপনারা শিশুদেরকে চুমু দেন, আমরা তো তাদেরকে চুমু দেই না। উত্তরে নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আল্লাহ তায়ালা তোমার অন্তর থেকে দয়ামায়া উঠিয়ে নিয়ে গেলে আমি তার কী করতে পারি?”
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَنْ عَالَ جَارِيَتَيْنِ حَتَّى تَبْلُغَا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَنَا وَهُوَ وَضَمَّ أَصَابِعَهُ
আনাস ইবনে মালিক ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি দুটি মেয়ে সন্তানকে সাবালক হওয়া পর্যন্ত প্রতিপালন করে, কিয়ামতের দিনে সে ও আমি এমন পাশাপাশি অবস্থায় থাকবো,” এ বলে তিনি তাঁর হাতের আঙ্গুলগুলো মিলিয়ে দিলেন।
নুমান ইবনে বাশির ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তার পিতা তাকে নিয়ে রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলেন এবং বললেন: আমি আমার এই পুত্রকে একটি গোলাম দান করেছি। তখন তিনি বললেন, “তোমার সব পুত্রকেই কি তুমি এরূপ দান করেছো?” তিনি বললেন: না। তখন তিনি বললেন, “তবে তুমি তা ফিরিয়ে নাও।”
সুরাকাহ ইবনে মালিক ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আমি কি তোমাদেরকে সর্বোত্তম সদাকার কথা বলব না? তা হলো তোমার কন্যা তোমার কাছে ফিরে এসেছে, তুমি ছাড়া তাকে কামাই করে খাওয়ানোর মতো কেউ নেই।”
দৈহিক ত্রুটির কারণে বিয়ে হয় নি, তালাকপ্রাপ্তা বা বিধবা কন্যার জন্য পিতা যা খরচ করবেন সবই সর্বোত্তম সদাকা বলে গণ্য হবে।
আবু তুফাইল ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি দেখলাম নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিইর্রানা নামক স্থানে গোশত বণ্টন করছেন। আবু তুফাইল বলেন, আমি সেদিন উটের গোশত বহনের কাজ করছিলাম। এমন সময়ে একজন মহিলা আসলেন, এমনকি নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটবর্তী হলেন। তখন তিনি নিজের চাদরখানা তাঁর জন্য বিছিয়ে দিলেন। তারপর মহিলা তাতে বসে পড়লেন। (বর্ণনাকারী বলেন) আমি লোকদেরকে বললাম এ মহিলা কে? তারা বলল: ইনি তাঁর সেই মা যিনি তাঁকে দুধ পান করিয়েছিলেন।
সহিহ মুসলিম ২৫৫২/১২ থেকে: ইবনে উমর ﵄রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন। আমি রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, “সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার হলো কোনো ব্যক্তির পিতার ইন্তেকালের পর তার বন্ধু-বান্ধবের সাথে সদ্ব্যবহার বজায় রাখা।”
মুফতি মুহাম্মদ শফী (2010). মা’আরেফুল কোরআন. ১ম বাংলা সংস্করণ. ঢাকা, বাংলাদেশ: মাকতাবাতুল আযহার.
মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (রহ.) (1983). পরিবার ও পারিবারিক জীবন. ঢাকা, বাংলাদেশ: তাওহীদ পাবলিকেশন্স.
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে পারিবারিক জীবন ও সামাজিক সম্পর্কের দিকনির্দেশনা।