যায়িদ ইবনে খালিদ জুহানি ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: হুদাইবিয়ায় রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের বৃষ্টির পর ভোরে আমাদের ফজরের নামাজ পড়ালেন। নামাজ শেষ করে তিনি লোকদের দিকে ফিরে বললেন, “তোমরা কি জানো তোমাদের রব কী বলেছেন?” তারা বলল: আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই অধিক জানেন। তিনি বললেন, “তোমাদের রব বলেছেন, আমার বান্দাগণ আজ এমন অবস্থায় ভোর করেছে যে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ আমার প্রতি ইমান পোষণকারী এবং কেউ আমাকে অস্বীকারকারী। সুতরাং যে বলেছে, আল্লাহর রহমত ও করুণায় আমরা বৃষ্টি লাভ করেছি, সে আমার প্রতি ইমান পোষণকারী এবং নক্ষত্রে অস্বীকারকারী। আর যে বলেছে, অমুক অমুক নক্ষত্রের প্রভাবে আমরা বৃষ্টি লাভ করেছি, সে আমার সাথে কুফরি করেছে এবং নক্ষত্রের প্রতি বিশ্বাস করেছে।”
শাদ্দাদ ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: নিশ্চয় আমি রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, “যে ব্যক্তি লোক দেখানোর জন্য নামাজ আদায় করল সে শিরক করল, যে ব্যক্তি লোক দেখানোর জন্য রোজা রাখল সে শিরক করল এবং যে ব্যক্তি লোক দেখানোর জন্য দান করল সে শিরক করল।”
আবু সাইদ খুদরি ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “দাজ্জালের চেয়েও যে বিষয়ে আমি তোমাদের জন্য বেশি ভয় পাই, সে বিষয়টি কি তোমাদের বলবো না?” আমরা বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, “বিষয়টি গোপন শিরক। তা এই যে, একজন সালাতে দাঁড়াবে এরপর যখন দেখবে যে, মানুষ তার দিকে তাকাচ্ছে তখন সে সালাত সুন্দর করবে।” (সুনান ইবনে মাজাহ ৪২০৪)
এখানে লক্ষণীয় যে, বান্দা যদি ইবাদতের ভক্তি ও বিনয় প্রকাশ একমাত্র আল্লাহর জন্যই মনে করে, কেবল মানুষের কিছু প্রশংসা আশা করে তবে তা রিয়া বলে গণ্য হবে। আর যদি বান্দা কেবল মানুষকে দেখানোর জন্য ইবাদতটি করে (লোকে না দেখলে করতো না) তবে তা শিরক আকবার বলে গণ্য হবে।
অসিলা উপকরণ বিষয়ক শিরক: সৃষ্টি জগতের নিয়ম আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাঁরই নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। এ বিশ্বাস রেখে মুমিন বলতে পারেন, বৃষ্টিতে ভিজে ঠাণ্ডা লেগেছে, বৃষ্টির কারণে ফসল ভালো হয়েছে, বিষের প্রভাবে তার মৃত্যু ঘটেছে, ঔষধ খেয়ে শরীরটা ভালো লাগছে ইত্যাদি। মুমিন এসব ক্ষেত্রেও মহান আল্লাহর ইচ্ছার কথা বলতে ভালোবাসেন। তবে কেউ যদি বিশ্বাস করে, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়াই ঔষধ রোগ সারায়, বিষ মানুষ মারে ইত্যাদি তবে তা ‘শিরক আকবর’ বলে গণ্য হবে। (ইসলামী আকীদা, পৃষ্ঠা ৪১৭)
ইবনে আব্বাস ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললো: আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন এবং আপনি যা ইচ্ছা করেন। তখন তিনি বললেন, “তুমি আমাকে আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়ে দিলে? বরং আল্লাহর একার ইচ্ছাই চূড়ান্ত।” (মুসনাদ আহমাদ ১৮৩৯)
শিরকে আসগর জাতীয় কথার মধ্যে রয়েছে: ‘আমি আল্লাহর ও আপনার উপর নির্ভর করে আছি,’ ‘উপরে আল্লাহ এবং নীচে আপনি ছাড়া আর কেউ নেই আমার,’ ‘আল্লাহ এবং আপনি না হলে কাজটি হতো না’ ইত্যাদি। আমরা দেখেছি, রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাক্য ব্যবহারে সতর্ক হতে শিক্ষা দিয়েছেন। যেমন: ‘আল্লাহর ইচ্ছাতেই হলো আর এরপর ছিল আপনার চেষ্টা,’ ‘আল্লাহর জন্যই বেঁচে গেলাম আর এরপর ছিল আপনার অবদান।’ (এভাবে বলা জায়েজ।) (ইসলামী আকীদা, পৃষ্ঠা ৪২৫)
ইবনে উমর ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: আল্লাহ ছাড়া কারও নামে শপথ করিও না। কেননা আমি রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, “যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া কারো নামে শপথ করল, সে কুফরি করল বা শিরক করল।”
রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলেন, “আমি তোমাকে একটি বিষয় শিখিয়ে দিচ্ছি যা পালন করলে ছোট ও বড় শিরক তোমার থেকে দূরীভূত হবে। তুমি (এ দোয়াটি) বলবে: اَللَّهُمَّ اِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَ أَنَا أَعْلَمُ وَ أَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لَا أَعْلَمُ (হে আল্লাহ! আমি জ্ঞাতসারে শিরক করা থেকে আপনার আশ্রয় গ্রহণ করছি এবং অজ্ঞাতসারে যা ঘটে তার জন্য আপনার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি)।”১(রাহে বেলায়াত, পৃষ্ঠা ৫৯৫)
আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “অশুভ বা কুলক্ষণ বলে কিছু নেই। বরং তা শুভ মনে করা ভালো।” কোনো একজন জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসুল! শুভ লক্ষণ কী? তিনি বললেন,‘(এরূপ) অর্থবোধক কথা যা তোমাদের কেউ শুনতে পায় (বা চায়)।”
অশুভ, অযাত্রা বা অমঙ্গলে বিশ্বাস করার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “অশুভ, অযাত্রা বা অমঙ্গল ভেবে যে তার কর্ম বা যাত্রা পরিত্যাগ করল, সে শিরক করল।” সাহাবিগণ বললেন: হে আল্লাহর রাসুল! এর কাফফারা কী? তিনি বললেন, “এ কথা বলবে যে, হে আল্লাহ! আপনার কল্যাণ ছাড়া কোনো কল্যাণ নেই, আপনার শুভ-অশুভ ছাড়া কোন শুভ বা অশুভ নেই এবং আপনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই।” (মুসনাদ আহমাদ ৭০৪৫)
এছাড়াও ভবিষ্যৎ বক্তা বা ভাগ্য বক্তার অর্থাৎ গণকের কথায় বিশ্বাস করার বিষয়ে আহমদে বর্ণিত হাদিসে আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যদি কেউ কোনো গণক বা ভবিষ্যৎ বক্তার নিকট গমন করে তার কথা বিশ্বাস করে তবে সে মুহাম্মাদ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর অবতীর্ণ দীনের প্রতি কুফরি করল।২(ইসলামী আকীদা, পৃষ্ঠা ৪২৮)