কুরআনের মর্যাদা

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَتَغَنَّ بِالْقُرْآنِ

আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি সুললিত (যথাসম্ভব সুন্দর ও মধুর) কণ্ঠে কুরআন পাঠ করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।”

“যখন কুরআন পাঠ করা হয় তখন তা কান লাগিয়ে শোনো এবং নীরব থাকো যাতে তোমাদের প্রতি রহম করা হয়।” (সুরা আল-আরাফ ৭:২০৪)

সহিহ আল-বুখারি ৫০৪৯ থেকে: নবি ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আমি অন্যের কাছ থেকে কুরআন শুনতে ভালোবাসি।”

عَنْ عُثْمَانَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ

উসমান ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। নবি ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে উত্তম যে কুরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়।”

সকল মুহাদ্দিস, ফকিহ ও বুজুর্গ এক বাক্যে বলেছেন যে, সকল জিকিরের শ্রেষ্ঠ জিকির হচ্ছে কুরআন তিলাওয়াত। (রাহে বেলায়াত, পৃষ্ঠা ২১৭)

অনেকে ভাবেন যে, কুরআনের তরজমা বা তাফসির করতে গিয়ে হয়তো আলিমের ভুল হতে পারে কাজেই তরজমা ও তাফসির পাঠের চেয়ে মানুষের লেখা অন্যান্য বই পড়ে ইসলাম শেখা উত্তম। কী অপূর্ব বিচার! কুরআনের তরজমার ক্ষেত্রে সবই আল্লাহর বাণীর তরজমা, হয়তো বা দুই-একটি স্থানে বুঝার ভুল হতে পারে। আর অন্যান্য ইসলামি বই-পুস্তক যারা লিখেছেন তারা ভুলে ভরা মানুষ, অন্যান্য ভুলে ভরা মানুষের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। (এহ্ইয়াউস সুনান, পৃষ্ঠা ৩৭০)

عَنْ جَابِرٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ الْقُرْآنُ مُشَفَّعٌ وَمَاحِلٌ مُصَدَّقٌ مَنْ جَعَلَهُ إِمَامَهُ قَادَهُ إِلَى الْجَنَّةِ وَمَنْ جَعَلَهُ خَلْفَ ظَهْرِهِ سَاقَهُ إِلَى النَّارِ

জাবির ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কুরআন এমন সুপারিশকারী যার সুপারিশ নিশ্চিতভাবে কবুল করা হবে এবং এমন বিতর্ককারী যার তর্ক মেনে নেওয়া হবে। যে ব্যক্তি এটিকে সম্মুখে রেখেছে এটি তাকে জান্নাতে টেনে নিয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি এটিকে পিছনে রেখেছে এটি তাকে ধাক্কা দিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।”

রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তোমরা কুরআন পাঠ করবে। কারণ কুরআন কিয়ামতের দিন তার সঙ্গীদের (কুরআন পাঠকারীগণের) জন্য শাফায়াত করবে।”১ (খুতবাতুল ইসলাম, পৃষ্ঠা ২৯০)

যে কুরআন কোটি কোটি মানবাত্মাকে আলোর পথ দেখিয়েছে আমরা মুসলমানগণ বর্তমান যুগে এর আলো গ্রহণ করছি না। আজ মুসলিম সমাজের কেউ কেউ কুরআন কারিমকে একেবারেই অবহেলা করে তাকে তুলে রেখেছেন। আমরা অনেক বই, পুস্তক বা সংবাদপত্র পড়ি কিন্তু আমাদের পাঠ্য তালিকায় আল্লাহর কিতাব নেই! কী অদ্ভূত মুসলমান আমরা! সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হলো অনেক ধার্মিক মুসলমানও কুরআন পাঠ করতে পারেন না, করেন না এবং এজন্য কোনো বেদনাও অনুভব করেন না। ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না এলাইহি রাজিউন। (এহ্ইয়াউস সুনান, পৃষ্ঠা ৩৬৮)

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِي بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللهِ يَتْلُونَ كِتَابَ اللهِ وَيَتَدَارَسُونَهُ بَيْنَهُمْ إِلَّا نَزَلَتْ عَلَيْهِمِ السَّكِينَةُ وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ وَحَفَّتْهُمُ الْمَلَائِكَةُ وَذَكَرَهُمُ اللهُ فِيمَنْ عِنْدَهُ

আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যখন কিছু লোক আল্লাহর ঘরে একত্রিত হয়ে আল্লাহর কিতাবের তেলাওয়াত ও দারসে রত থাকে তখন তাদের উপর প্রশান্তি নাজিল হয় এবং রহমত তাদেরকে ঢেকে নেয়। আর ফেরেশতারা তাদেরকে ঘিরে রাখে এবং আল্লাহ নিকটস্থ ফেরেশতাদের কাছে তাদের সম্পর্কে আলোচনা করেন।”

সহিহ আল-বুখারি ৩৮০৬ থেকে: আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, “কুরআন পাঠ শিখো চারজনের নিকট থেকে; (আব্দুল্লাহ) ইবনে মাসউদ, আবু হুযাইফার আযাদকৃত গোলাম সালিম, উবাই (ইবনে কা’ব) ও মুয়াজ ইবনে জাবাল থেকে।”

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِأَصْحَابِهِ أَيَعْجِزُ أَحَدُكُمْ أَنْ يَقْرَأَ ثُلُثَ الْقُرْآنِ فِي لَيْلَةٍ فَشَقَّ ذَلِكَ عَلَيْهِمْ وَقَالُوا أَيُّنَا يُطِيقُ ذَلِكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَقَالَ اللَّهُ الْوَاحِدُ الصَّمَدُ ثُلُثُ الْقُرْآنِ

আবু সাইদ খুদরি ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবিদের বললেন, “এক রাতে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ তেলাওয়াত করা তোমাদের কেউ কি সাধ্যাতীত মনে করো?” এ প্রশ্ন তাদের জন্য কঠিন ছিল। তারপর তারা বলল: ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাদের মধ্যে কার সাধ্য আছে এটা পারবে! তখন তিনি বললেন, “কুল হু ওয়াল্লাহু আহাদ (সুরা আল-ইখলাস) কুরআনের তিন ভাগের এক ভাগ।”

মুয়াজ ইবনু আনাস ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “যে ব্যক্তি ১০ বার সুরা ইখলাস পাঠ করবে, আল্লাহ তাঁর জন্য জান্নাতে একটি বাড়ি বানিয়ে রাখবেন।”২ (রাহে বেলায়াত, পৃষ্ঠা ৫১২)

عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ الَّذِي لَيْسَ فِي جَوْفِهِ شَيْءٌ مِنَ الْقُرْآنِ كَالْبَيْتِ الْخَرِبِ

ইবনে আব্বাস ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তির পেটে কুরআনের কোনো অংশ নেই (অর্থাৎ কুরআন শিক্ষা করেনি) তা বিরান ঘরের মতো।”

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُقَالُ لِصَاحِبِ الْقُرْآنِ اقْرَأْ وَارْتَقِ وَرَتِّلْ كَمَا كُنْتَ تُرَتِّلُ فِي الدُّنْيَا فَإِنَّ مَنْزِلَكَ عِنْدَ آخِرِ آيَةٍ تَقْرَؤُهَا

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “(কিয়ামতের দিন) কুরআন পাঠকারীকে বলা হবে, কুরআন পড়ো ও জান্নাতের মনজিলে আরোহণ করো এবং তারতিলসহ (অর্থাৎ বোঝা যায় এমনভাবে) কুরআন পড়তে থাকো যেমন তুমি দুনিয়ায় পড়তে। কারণ জান্নাতে তোমার স্থান হবে তোমার পড়া শেষ আয়াতটি পর্যন্ত।”

ইবনে উমর ﵄রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “শুধু দু’ব্যক্তিকেই হিংসা করা যায়; যাকে আল্লাহ কুরআন দান করেছেন আর সে রাত-দিন শুধু কুরআন তেলাওয়াত বা কুরআন পালনে ব্যস্ত থাকে এবং যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন আর সে রাত-দিন সম্পদ হক পথে ব্যয় করতে থাকে।”৩ (রাহে বেলায়াত, পৃষ্ঠা ২৩৭)

عَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِنَّمَا مَثَلُ صَاحِبِ الْقُرْآنِ كَمَثَلِ صَاحِبِ الْإِبِلِ الْمُعَقَّلَةِ إِنْ عَاهَدَ عَلَيْهَا أَمْسَكَهَا وَإِنْ أَطْلَقَهَا ذَهَبَتْ

ইবনে উমর ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কুরআন ওয়ালা (সাহিবে কুরআন, যারা পূর্ণাঙ্গ বা আংশিক হাফেজ)-এর দৃষ্টান্ত উটওয়ালার ন্যায়। সে উট বেঁধে রাখলে উট তার নিয়ন্ত্রণে থাকে। আর যদি বাঁধন খুলে দেয় তবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।”

কুরআনের যে অংশ মুখস্থ আছে তা নামাজে ও নামাজের বাইরে পড়তে থাকতে হবে, তাহলে মুখস্থ থাকবে। কিন্তু না পড়লে অর্থাৎ ছেড়ে দিলে ভুলে যাবে।

عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَاهِرُ بِالْقُرْآنِ مَعَ السَّفَرَةِ الْكِرَامِ الْبَرَرَةِ وَالَّذِي يَقْرَأُ الْقُرْآنَ وَيَتَتَعْتَعُ فِيهِ وَهُوَ عَلَيْهِ شَاقٌّ لَهُ أَجْرَانِ

আয়িশা ﵂রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কুরআনে অভিজ্ঞ ব্যক্তি ঐসব ফেরেশতার মতো যারা লেখক, সম্মানিত ও মর্যাদাবান। আর যে ব্যক্তি কুরআন পড়ে এবং তার জন্য কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও বারবার পড়ে, তার জন্য দ্বিগুণ পুরস্কার রয়েছে।”

আল্লাহ বার বার বলেছেন যে, কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্য হলো যেন মানুষেরা তা বুঝে, চিন্তা করে এবং উপদেশ গ্রহণ করে।

আল্লাহ কুরআনে চার স্থানে বলেছেন: নিশ্চয় আমি কুরআনকে বোঝার ও উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছি। কে আছে উপদেশ গ্রহণ করার? (সুরা আল-কমার ৫৪:১৭, ২২, ৩২, ৪০)

কুরআন কারিমের একটি আয়াত তেলাওয়াত করা (অর্থ বোঝা ও অনুধাবন করা) ১০০ রাকাআত নফল সালাতের চেয়েও উত্তম বলে হাদিস শরিফে বলা হয়েছে। (সুনান ইবনে মাজাহ ২১৯)

যদি দুনিয়ার কোনো মন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি আপনাকে একটি চিঠি পাঠান, তা পড়তে ও বুঝতে আপনি কত ব্যস্ত হন। আর রব্বুল আলামিন আল্লাহ তাঁর হাবিব মুহাম্মাদ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাধ্যমে আপনাকে এ কিতাবটি পাঠালেন আর আপনি একটু পড়ে দেখলেন না। আল্লাহর কাছে যেয়ে কী জবাব দেবেন? (খুতবাতুল ইসলাম, পৃষ্ঠা ২৮৯)


  1. সহিহ মুসলিম ৮০৪/২৫২↩︎

  2. মুসনাদ আহমাদ ১৫৬১০↩︎

  3. সহিহ আল-বুখারি ৫০২৫↩︎

বিষয়বস্তুতে যান

যোগাযোগ

মতামত, সংশোধনী বা যে কোনো পরামর্শ জানাতে এই ফর্মটি ব্যবহার করুন।