ইবনে উমর ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। নবি ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান মাস নিয়ে আলোচনা করলেন, অতঃপর তিনি বললেন, “তোমরা (রমজানের) চাঁদ না দেখে রোজা শুরু করবে না এবং (শাওয়ালের) চাঁদ না দেখে ইফতার করবে না (রোজা ভাঙবে না)। আর যদি আকাশ মেঘলা থাকে তবে তিরিশ দিন পূর্ণ করো।”
আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “রমজান মাস আগমন করলে জান্নাতের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর শয়তানগুলোকে শিকলে বন্দী করা হয়।”
জামি আত-তিরমিজি ৬৮২ থেকে: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যখন রমজানের প্রথম রাত আসে, তখন প্রত্যেক রাতেই একজন আহ্বানকারী আহ্বান করতে থাকে, يَا بَاغِيَ الْخَيْرِ أَقْبِلْ وَيَا بَاغِيَ الشَّرِّ أَقْصِرْ (হে ভালো আমলের অন্বেষণকারী অগ্রসর হও। আর হে খারাপ আমলকারী থেমে যাও)।”
আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “(রোজা রেখেও) যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও তদনুযায়ী কাজ করা পরিত্যাগ করল না, তার শুধু খাদ্য ও পানীয় পরিত্যাগ করা আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।”
আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “রোজা ঢাল স্বরূপ। সুতরাং নির্লজ্জ কাজ করবে না এবং মূর্খদের মতো আচরণ করবে না। কেউ তার সাথে ঝগড়া করতে আসলে অথবা গালি দিলে তাকে বলবে আমি রোজাদার (দুই বার বলবে)।”
আদম সন্তানের প্রতিটি কাজের সওয়াব দশগুণ থেকে সাতশগুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়। মহান আল্লাহ বলেন: তবে রোজা ব্যতীত, কেননা তা আমারই জন্য এবং এর বদলা আমিই দিবো। বান্দা আমারই জন্য তার প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং পানাহার বর্জন করে। রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ; একটি ইফতারের সময় এবং অপরটি তার রবের সাথে সাক্ষাতের সময়। রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিসকের সুগন্ধির চেয়েও সুগন্ধিময়। (সহিহ মুসলিম ১১৫১/১৬৪)
রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যদি কোনো ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করায়, তাহলে সে উক্ত রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে, তবে এতে উক্ত রোজাদারের সওয়াব একটুও কমবে না।”১(সালাত, দু’আ ও যিকর, পৃষ্ঠা ১৭০)
আবু আইউব আনসারি ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি রমজান মাসে রোজা রাখল এরপর শাওয়াল মাসে ছয় দিন রোজা রাখল তবে সে যেন সারা বছর রোজা রাখল।”
সহিহ মুসলিম ১১৬২/১৯৬ থেকে: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: প্রতি মাসে তিন দিন সাওম পালন করা এবং রমজান মাসের সাওম, এক রমজান থেকে পরবর্তী রমজান পর্যন্ত সারা বছর সাওম পালনের সমান। আরাফা দিবসে সাওম সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী যে, তাতে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বছরের গুনাহের ক্ষতিপূরণ হয়ে যাবে। আর আশুরার সাওম সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী যে, তাতে পূর্ববর্তী বছরের গুনাহসমূহের কাফফারা হয়ে যাবে।
আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জিবরাইল ﵇আলাইহিস সালাম প্রতি বছর নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে একবার কুরআন তেলাওয়াত করে শোনাতেন ও শুনতেন, কিন্তু যে বছর তিনি ওফাত লাভ করেন সে বছর জিবরাইল ﵇আলাইহিস সালাম এ কাজ দুই-দুইবার করেন এবং তিনি সাধারণত প্রতি বছর রমজান মাসে দশদিন ইতিকাফে বসতেন কিন্তু যে বছর তিনি ওফাত লাভ করেন সে বছর বিশ দিন ইতিকাফ করেন।
সুনান ইবনে মাজাহ ১৭৮১-এর বর্ণনায় এসেছে: ইতিকাফকারী সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “ইতিকাফকারী ব্যক্তি গুনাহসমূহ থেকে বেঁচে থাকে এবং তাকে ঐ ব্যক্তির নেক আমলের মত সওয়াব দেওয়া হয় যে ব্যক্তি (বাইরে থেকে) সকল ধরনের নেক আমল করে।”
আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরে ইমানসহ সওয়াবের আশায় নামাজ পড়ল, তার অতীতের গুনাহ সমূহ মাফ করে দেওয়া হয়। আর যে ব্যক্তি সওয়াবের আশায় ইমানসহ রমজানের রোজা রাখল, তারও অতীতের গুনাহ সমূহ মাফ করে দেওয়া হয়।”
রমজানে মৃত্যুবরণ করলে অথবা রমজান মাসে কবরের আজাব হয় না- এই মর্মে কোনো সহিহ বা গ্রহণযোগ্য দুর্বল হাদিস আমাদের নজরে পড়ে নি। (জিজ্ঞাসা ও জবাব, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৫)
আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি রমজানে ইমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় তারাবির সালাতে দাঁড়াবে তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হবে।”
“যখন তাদের কাছে আল্লাহর আয়াত তেলাওয়াত করা হয়, তখন তাদের ইমান বৃদ্ধি পায়।” (সুরা আল-আনফাল ৮:২)
আয়াতের অর্থ বুঝতে পারার কারণে হৃদয় আলোড়িত হয়, ফলে ইমান বৃদ্ধি পায়।
রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝে ও অর্থ হৃদয়ঙ্গম করার জন্য তিন দিনের কমে কুরআন খতম করতে নিষেধ করেছেন। সাধারণ সুন্নাত হলো সাত দিনে বা এক মাসে পূর্ণ কুরআন একবার পড়ে শেষ করা। এক বছরের মধ্যে কুরআন একবার পড়ে শেষ করতে না পারা দুর্ভাগ্যের লক্ষণ। (এহ্ইয়াউস সুনান, পৃষ্ঠা ৩৬৬)
উমর ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সময়ে ৮ ও ২০ রাকআত তারাবি পড়া হতো বলে সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। কিয়ামুল লাইলের মূল সুন্নাত হলো নামাজে দাঁড়িয়ে কুরআন তিলাওয়াত করা। অথচ আমরা তিলাওয়াত ও শ্রবণের চেয়ে সংখ্যা গণনা করা ও তাড়াতাড়ি করাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। সাহাবি ও তাবেয়িগণ ৫/৬ ঘণ্টা ধরে তারাবি পড়তেন। আমরা এক ঘণ্টাও দাঁড়াতে চাই না। (সালাত, দু’আ ও যিকর, পৃষ্ঠা ১৭৬–১৭৭)
হাফেজ সাহেব যখন দ্রুত পড়েন তখন অনেক অক্ষর স্পষ্ট হয় না, এমনকি আরবিও বুঝা যায় না। এমন হলে খতম তো হবেই না বরং গুনাহ হবে কুরআন বিকৃত করার কারণে। সাধারণত দ্রুত তারাবি পড়তে যে সময় লাগে, তার চেয়ে যদি ২০/২৫ মিনিট বেশি সময় লাগানো যায়, তবে সহিহ ও সুন্দরভাবে কুরআন পড়া যাবে। আর যদি একান্তই কারো সময় না থাকে তবে তিনি সুরা তারাবি পড়বেন। অন্তত দ্রুত পড়ে কুরআন ধ্বংস করবেন না। (জিজ্ঞাসা ও জবাব, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৫৬)
ইবনে উমর ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদর খোঁজ করে পেতে চায় তবে সে যেন রমজানের শেষ দশকে তা খোঁজ করে।”
লাইলাতুল কদর এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এই এক রাতের এবাদত হাজার মাস (৮৩ বছরের বেশি)-এর এবাদত অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। (মা’আরেফুল কোরআন)
আয়িশা ﵂রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন: হে আল্লাহর রাসুল! আমি লাইলাতুল কদরে কী দোয়া করব? তখন তিনি এ দোয়াটি শিখিয়ে দেন, اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ كَرِيمٌ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي (হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল (উদার), আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন)। (জামি আত-তিরমিজি ৩৫১৩)
লাইলাতুল কদরে সালাতের সাজদায়, সালামের আগে, সালামের পরে এবং অন্যান্য সকল দিনে ও রাতে, সকল সালাতে ও সাধারণ সময়ে দুআটি পাঠ করা যায়। (রাহে বেলায়াত, পৃষ্ঠা ৫৭৬)
যেহেতু রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর খোঁজ করতে বলেছেন, তাই লাইলাতুল কদরের ফজিলত পেতে হলে শেষ দশ রাতই ইবাদত করতে হবে। কারণ এই দশ রাতের যে কোনো এক রাত লাইলাতুল কদর। দশ রাতের প্রতি রাতে একই ধরনের ইবাদত করার চেষ্টা করতে হবে। যেমন: কিয়ামুল লাইল, তেলাওয়াত, তসবিহ-তাহলিল, দান, ইত্যাদি।