ইসহাক (ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আবু তালহা) তার চাচা আনাস ইবনে মালিক ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “বান্দা যখন আল্লাহর কাছে তওবা করে তখন আল্লাহ ঐ ব্যক্তির চেয়েও বেশি আনন্দিত হন, যে ব্যক্তি মরুভূমিতে নিজ সওয়ারিতে ছিল। তারপর সওয়ারিটি তার থেকে হারিয়ে যায়। সওয়ারির উপর ছিল তার খাদ্য এবং পানীয়। এরপর সে নিরাশ হয়ে একটি গাছের ছায়ায় এসে আরাম করে এবং তার সওয়ারির (উটের) ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় হঠাৎ উটটি তার কাছে এসে দাঁড়ায়। অমনি সে তার লাগাম ধরে ফেলে। এরপর সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলে ওঠে,
اللهُمَّ أَنْتَ عَبْدِي وَأَنَا رَبُّكَ
হে আল্লাহ, তুমি আমার বান্দা এবং আমি তোমার রব।
সে আনন্দের আতিশয্যে ভুল করে ফেলেছে।”
বেশি খুশি হওয়ার কারণে সে যে কত বড় ভুল করে ফেলেছে তা সে বুঝতে পারে নি। তার বলা উচিত ছিল,
আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে কাঁদে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না, যেমন স্তন থেকে নির্গত দুধ পুনরায় স্তনে প্রবেশ করানো সম্ভব নয়। আর আল্লাহর পথের ধুলা-বালি এবং জাহান্নামের ধোঁয়া কখনো একত্র হবে না।”
জামি আত-তিরমিজি ১৬৬৯ থেকে: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “মহান আল্লাহর কাছে দুটি ফোঁটা ও দুটি নিদর্শন (চিহ্ন)-এর চেয়ে প্রিয় জিনিস আর নেই। একটি হলো আল্লাহর ভয়ে নির্গত চোখের পানি এবং অন্যটি হলো আল্লাহর রাস্তায় (প্রবাহিত) রক্ত বিন্দু। আর দুটি চিহ্নের একটি হলো আল্লাহর রাস্তায় প্রাপ্ত আঘাতের চিহ্ন এবং অন্যটি হলো আল্লাহর ফরজগুলোর মধ্য থেকে কোনো ফরজ আদায় করার চিহ্ন।”
‘মুমিনকে সদা সর্বদা নিজের পাপের কথা চিন্তা করতে হবে। এমনকি আল্লাহর অগণিত নিয়ামতের বিপরীতে তাঁর ইবাদতের দুর্বলতাকেও পাপ হিসেবে গণ্য করে সকাতরে সর্বদা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে।” (রাহে বেলায়াত, পৃষ্ঠা ১০৯)
আয়িশা ﵂রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অট্টহাস্য করতে দেখি নি যাতে তাঁর আলজিহ্বা (মুখের ভিতর) দেখা যায়। বরং তিনি কেবল মুচকি হাসতেন।
রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “বেশি হাসবে না, কেননা বেশি হাসি অন্তরকে মেরে ফেলে।” (আল-আদাবুল মুফরদ ২৫৩)
আয়িশা ﵂রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি জাহান্নামের আগুনের কথা স্মরণ করে কাঁদতে লাগলেন। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, “তুমি কাঁদছ কেন?” তিনি (আয়িশা ﵂রাদিয়াল্লাহু আনহা) বললেন: আমি জাহান্নামের আগুনের কথা স্মরণ করে কাঁদছি। আপনি কি কিয়ামতের দিন আপনার পরিবার (স্ত্রীদের) কে স্মরণ করবেন না? রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “মনে রেখো, তিনটি স্থানে কেউ কাউকে স্মরণ করবে না:
মিজানের নিকট, যে পর্যন্ত সে না জানতে পারবে তার পাল্লা হালকা হবে না ভারী হবে।
আমলনামার সময়, যখন ডেকে বলা হবে, এসো এবং তোমার আমলনামা পড়ে দেখো, যে পর্যন্ত সে না জানতে পারবে যে, তার আমলনামা কোথায় পড়েছে ডান হাতে না পিছন দিক থেকে বাম হাতে।
পুলসিরাতের নিকট, যখন একে জাহান্নামের পৃষ্ঠের মধ্যবর্তী স্থানে স্থাপন করা হবে।”
আল্লাহ বলেন, “যখন তারা রাসুলের প্রতি নাজিলকৃত বাণী শুনতে পায়, তখন তুমি দেখতে পাও যে, সত্যকে চেনার প্রভাবে তাদের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে যায়।” (সুরা আল-মায়েদা ৫:৮৩)
রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কিয়ামতের দিন আল্লাহ সাত শ্রেণির লোককে তাঁর (আরশের) ছায়ায় স্থান দিবেন তন্মধ্যে (এক শ্রেণি) ঐ ব্যক্তি যে একাকী নিভৃতে আল্লাহকে এমনভাবে স্মরণ করে যে, তার দুই চোখ থেকে অশ্রু নির্গত হয়।” (সহিহ আল-বুখারি ১৪২৩)
রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কাঁদো; যদি কাঁদতে না পারো তবে কাঁদার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করো।” (সুনান ইবনে মাজাহ ৪১৯৬)
আনাস ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: একদা রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সামনে এক ভাষণ প্রদান করেন যেমনটি আর কখনো শুনি নি। তিনি বলেন, “আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে পারতে তবে নিশ্চয় খুব কম হাসতে আর খুব বেশি কাঁদতে।” একথা শুনে রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবিগণ কাপড়ে মুখমণ্ডল ঢেঁকে ফেলেন এবং ডুকরে ডুকরে কাঁদতে শুরু করেন।
সহিহ আল-বুখারি ২৭৫৩-এর বর্ণনা থেকে পাই, রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রাণপ্রিয় কন্যা ফাতিমা ﵂রাদিয়াল্লাহু আনহা-কে বলেন: يَا فَاطِمَةُ بِنْتِ مُحَمَّدٍ سَلِيْنِىْ مَا شِئْتِ مِنْ مَالِىْ لَا أُغْنِىْ عَنْكِ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا (হে ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ! (দুনিয়ায়) আমার ধন-সম্পদ থেকে যা ইচ্ছা চেয়ে নাও। (পরকালে) আল্লাহর আজাব থেকে বাঁচার জন্য আমি তোমার কোনো উপকার করতে পারবো না)।
মুতাররিফ ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: আমি নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে দেখি তিনি নামাজ পড়ছেন এবং তাঁর বুকের ভেতর এমন শব্দ হচ্ছে যেমন রান্নার সময় হাড়ির মধ্যে হয় অর্থাৎ তিনি ফুঁপিয়ে কাঁদছেন।
আমাদের কর্তব্য হচ্ছে আল্লাহর প্রশংসা করে এবং রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি দরুদ পড়ে, অসহায় ও কাতর হৃদয়ে দৃঢ় আশা নিয়ে দোয়া করা। আমরা সারারাত অঘোরে ঘুমিয়ে না থেকে নির্জনে একাকী রাতের কিছু সময় দাঁড়িয়ে যাই আর আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে এবং নিজের পাপের কথা স্মরণ করে দু’চোখের পানি ফেলে আল্লাহর দরবারে মাফ চাই।
হে আল্লাহ, তুমি বলেছো, “নিশ্চয় আল্লাহ যাকে চান গোমরাহ করে দেন এবং যাকে চান হেদায়াত দান করেন।” (ফাতির ৩৫:৮)
তুমি রাসুল ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চাচার হত্যাকারীকে হেদায়াত দিয়ে সম্মানিত করেছো। আবার তাঁর যে চাচা তাঁকে লালন-পালন করেছেন আর কষ্ট স্বীকার করে বিপদের সময় তাঁকে সহযোগিতা করেছেন, তাঁর সেই চাচা হেদায়াত পান নি। হেদায়াতের মালিক হে দয়াময় আল্লাহ, আমি যেন হেদায়াতের পথ থেকে সরে না যাই সেজন্য তুমি আমাকে তোমার পথে দৃঢ় রেখো।
হে আমাদের রব, হেদায়াত দেওয়ার পর আমাদের দিলকে বাঁকা করে দিও না (বিপথগামী কোরো না)। আর তোমার নিজের তরফ থেকে রহমত দান করো। নিশ্চয় তুমি প্রকৃত দাতা। (আলে ইমরান ৩:৮)
আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তোমাদের মাঝে এমন কেউ নেই যার আমল তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারবে।” অতঃপর তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনিও না? তিনি বললেন, “আমিও না।” তবে আল্লাহ তাঁর রহমত দ্বারা আমাকে ঢেকে নেবেন।
তাই সিজদারত অবস্থায় কাতর হৃদয়ে দোয়া করি: رَبِّ اغْفِرْ وَ ارْحَمْ وَ أَنْتَ خَيْرُ الرَّحِمِيْنَ (হে প্রভু! আমাকে মাফ করো, আমার প্রতি রহম করো। আর তুমিই সর্বোত্তম রহমকারী, দয়ালু)। (সুরা আল-মুমিনুন ২৩:১১৮)
হে আল্লাহ! রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাধ্যমে তুমি বলেছ: إِنَّ رَحْمَتِي غَلَبَتْ غَضَبِي (নিশ্চয় আমার রহমত আমার ক্রোধের তুলনায় অনেক বেশি)। (সহিহ আল-বুখারি ৩১৯৪)
হে দয়াময়, সেই হাশরের কঠিন দিনে তোমার রহমতের ছায়ায় (আরশের ছায়ায়) স্থান দিও।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অনুভব করছি আমি বড় একা। হে আল্লাহ, আমার মৃত্যুর পর প্রথম মঞ্জিল কবরসহ সকল মঞ্জিলে আমার অভিভাবক হয়ে যাও।
হে আসমান ও জমিনের স্রষ্টা, তুমিই দুনিয়া ও আখিরাতে আমার অভিভাবক, আমাকে মুসলিম অবস্থায় মৃত্যু দিও এবং নেক লোকদের সাথে আমাকে শামিল করে নিও। (সুরা ইউসুফ ১২:১০১)