কৃতজ্ঞতা

عَنِ الْمُغِيرَةِ يَقُولُ قَامَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى تَوَرَّمَتْ قَدَمَاهُ فَقِيلَ لَهُ غَفَرَ اللَّهُ لَكَ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ قَالَ أَفَلاَ أَكُونُ عَبْدًا شَكُورًا

মুগিরা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে (নামাজে) এতটা দাঁড়াতেন যে, তাঁর পদদ্বয় ফুলে যেতো। তাঁকে বলা হলো, আল্লাহ তো আপনার পূর্বাপর (সকল) গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। (এর পরেও কেন দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে নফল নামাজ পড়ছেন?) তিনি বললেন, “আমি কি আল্লাহর শোকরগুজার বান্দা হবো না?”

ফেরাউন বাদশা হওয়ায় অহংকার করে বলেছিল আমি বড় খোদা। অথচ সুলাইমান ﵇আলাইহিস সালাম তার চেয়েও বড় বাদশা ছিলেন। মানুষ, জিন, পশু-পাখি ও পিপীলিকা তাঁর প্রজা ছিল এবং তিনি তাদের কথাও বুঝতেন। একবার সুলাইমান ﵇আলাইহিস সালাম বাহিনী নিয়ে এক প্রান্তর অতিক্রম করছিলেন। তখন প্রান্তরে অবস্থিত রাণী পিঁপড়া বলল: হে পিঁপড়ারা গর্তে ঢুকে পড়ো নচেৎ সুলাইমানের বাহিনী তোমাদের পিষে ফেলবে। সুলাইমান ﵇আলাইহিস সালাম পিঁপড়ার কথা বুঝতে পেরে মুচকি হাসলেন এবং বুঝলেন আল্লাহ তাঁকে কতো বড় নিয়ামত দিয়েছেন। দেখুন! কিভাবে বিনয়ের সাথে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন, “হে আমার রব, তুমি আমাকে সামর্থ্য দাও যাতে আমি তোমার নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি, যা তুমি আমাকে ও আমার পিতা-মাতাকে দান করেছো। আর এমন নেক আমল করার তাওফিক দাও, যা তুমি পছন্দ করো। আর তোমার অনুগ্রহে আমাকে তোমার নেক বান্দাদের মধ্যে শামিল করে নাও।” (সুরা আন-নামল ২৭:১৯)

আবার ইউসুফ ﵇আলাইহিস সালাম-কে আল্লাহ কিভাবে মহিলার হাত থেকে রক্ষা করলেন, কারাগার থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করলেন এবং রাষ্ট্রের সম্মানজনক পদে অধিষ্ঠিত করলেন। ইউসুফ ﵇আলাইহিস সালাম বিনয়ের সাথে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন এভাবে, “হে আমার রব! তুমি আমাকে রাষ্ট্রক্ষমতা দিয়েছ এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিখিয়েছ। হে আসমান ও জমিনের স্রষ্টা! তুমি দুনিয়া ও আখিরাতে আমার অভিভাবক। আমাকে মুসলিম অবস্থায় মৃত্যু দিও আর নেক লোকদের সাথে আমাকে শামিল করো।” (সুরা ইউসুফ ১২:১০১)

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ يَقُولُ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ أَوَّلَ مَا يُسْأَلُ عَنْهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَعْنِي الْعَبْدَ مِنَ النَّعِيمِ أَنْ يُقَالَ لَهُ أَلَمْ نُصِحَّ لَكَ جِسْمَكَ وَنُرْوِيَكَ مِنَ الْمَاءِ الْبَارِدِ

আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “নিশ্চয় বিচারের দিন বান্দাদেরকে প্রথমে নিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। তাকে বলা হবে, আমি (আল্লাহ) কি তোমাকে সুন্দর স্বাস্থ্য দিই নি এবং ঠাণ্ডা পানি দ্বারা পরিতৃপ্ত করি নি (এর বিনিময়ে তুমি কী করেছ)?”

“আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামত সম্পর্কে তোমাদেরকে অবশ্যই জিজ্ঞেস করা হবে।” (সুরা আত-তাকাসুর ১০২:৮)

আল্লাহ আমাদেরকে দেহ, চোখ, কান দিয়েছেন। কথা বলার জন্য জিহ্বা, ঠোঁট ও নাক দিয়েছেন। জ্ঞান, আলো, বাতাস, রকমারী খাবার ইত্যাদি অফুরন্ত নিয়ামত দিয়েছেন। এসবের বিনিময়েই আমাদের উচিত তার হুকুম পালন (ইবাদত) করা, তাতে যদি তিনি আমাদেরকে পরকালে পুরস্কৃত নাও করেন তবুও আমাদের প্রতি অবিচার করা হবে না। কিন্তু আমাদের প্রতি মহান আল্লাহর অনুগ্রহ কী বিরাট! যে, তাঁর হুকুম পালন করলে তিনি আমাদেরকে পরকালে পুরস্কার স্বরূপ জান্নাতও দিবেন।

সহিহ আল-বুখারি ৩৪৬৪ থেকে: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “বনি ইসরাইলের মধ্যে তিনজন লোক ছিলো; একজন শ্বেতরোগী, একজন মাথায় টাকওয়ালা এবং একজন অন্ধ। মহান আল্লাহ তাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য একজন ফেরেশতা পাঠালেন। ফেরেশতা প্রথমে শ্বেতরোগীর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন: তোমার প্রিয় জিনিস কী? সে বললো, সুন্দর চামড়া কেননা মানুষ আমাকে ঘৃণা করে। ফেরেশতা তার শরীরে হাত বুলিয়ে দিলেন এবং তার চামড়া সুন্দর হয়ে গেলো। ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞেস করলেন: তোমার কোন সম্পদ বেশি প্রিয়? সে বললো, উট। অতএব তাকে একটি দশ মাসের গর্ভবতী উট দেওয়া হলো এবং ফেরেশতা এতে বরকতের জন্য দোয়া করলেন। এরপর ফেরেশতা টাকওয়ালা ব্যক্তির কাছে গিয়ে বললেন: তোমার প্রিয় জিনিস কী? সে বললো, সুন্দর চুল। ফেরেশতা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ায় তার সুন্দর চুল হলো। ফেরেশতা তাকে বললো যে, তোমার প্রিয় সম্পদ কী? সে বললো, গরু। অতঃপর তাকে একটি গর্ভবতী গাভী দান করা হলো। ফেরেশতা এতে বরকতের দোয়া করলেন। এরপর ফেরেশতা অন্ধ ব্যক্তির নিকট আসলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন: কোন জিনিস তোমার অধিক প্রিয়? সে বললো, আল্লাহ যেন আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন যাতে আমি মানুষকে দেখতে পাই।” নবি ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “ফেরেশতা তখন তার চোখের উপর হাত বুলিয়ে দিলেন তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলেন। ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞেস করলেন: কোন সম্পদ তোমার অধিক প্রিয়? সে বললো, ছাগল। তখন তিনি তাকে একটি গর্ভবতী ছাগী দিলেন। পরবর্তীতে একজনের উট বাচ্চা দেওয়ায় উটে ময়দান ভরে গেলো, অপরজনের গাভী বাচ্চা দেওয়ায় গরুতে মাঠ ভরে গেলো এবং আরেকজনের ছাগী বাচ্চা দেওয়ার ফলে ছাগলে ময়দান ভরে গেলো। অতঃপর ফেরেশতা পূর্ববর্তী আকৃতি ধারণ করে শ্বেতরোগীর কাছে এসে বললেন: আমার সফরের সম্বল শেষ হয়ে গিয়েছে। আজ আমার গন্তব্যস্থলে পৌঁছার জন্য আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপায় নেই। আজ আমি ঐ আল্লাহর নামে তোমার কাছে একটি উট চাচ্ছি, যে আল্লাহ তোমাকে সুন্দর চামড়া এবং ময়দান ভর্তি উট দান করেছেন। অথচ তুমি শ্বেতরোগী ছিলে, ফকির ছিলে। তখন সে বললো, আমি তো এ সম্পদ আমার পূর্বপুরুষ থেকে ওয়ারিশসূত্রে পেয়েছি। ফেরেশতা বললেন: তুমি মিথ্যাবাদী হলে আল্লাহ তোমাকে পূর্বের মতো করে দিন। অতঃপর ফেরেশতা টাকওয়ালার কাছে গিয়ে একই কথা বললেন। টাকওয়ালাও একই রূপ জবাব দিল। তখন ফেরেশতা বললেন: যদি তুমি মিথ্যাবাদী হও তাহলে আল্লাহ তোমাকে পূ্র্বের অবস্থা্য় ফিরিয়ে দিন। (ফলে তাদের উভয়েরই অবস্থা পূর্বের ন্যায় হয়ে গেলো।)” অতঃপর ঐ ফেরেশতা অন্ধ লোকটির নিকট আসলেন এবং বললেন: আমি একজন নিঃস্ব লোক এবং ফকির মানুষ। আমার সফরের সম্বল শেষ হয়ে গিয়েছে, আর বাড়ি পৌঁছার ব্যাপারে আল্লাহ ছাড়া কোনো গতি নেই। তাই আমি তোমার নিকট আল্লাহর নামে একটি ছাগী প্রার্থনা করছি, যিনি তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। সে বললো, আমি প্রকৃতপক্ষে অন্ধ ছিলাম। আল্লাহ আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমি ফকির ছিলাম। আল্লাহ আমাকে সম্পদশালী করেছেন। এখন তুমি যা চাও নিয়ে যাও। আল্লাহর কসম, আল্লাহর জন্য তুমি যা কিছু নিবে, তার জন্য আমি তোমার নিকট কোনো প্রশংসাই দাবি করব না। তখন ফেরেশতা বললেন: তোমার সম্পদ তুমি রেখে দাও। তোমার পরীক্ষা নেওয়া হলো মাত্র। আল্লাহ তোমার উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন।”

আল্লাহ শ্বেতরোগী ও টাকওয়ালার উপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন। তারা উভয়ই অহংকার প্রকাশ করে আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে নি। তারা অহংকারী ও অকৃতজ্ঞ হয়ে গিয়েছিলো। আর ঐ অন্ধব্যক্তি আল্লাহর নিয়ামত পেয়ে শুকরিয়া আদায় করেছে। প্রকৃতপক্ষে সে ছিলো কৃতজ্ঞ ও বিনয়ী।

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِذَا نَظَرَ أَحَدُكُمْ إِلَى مَنْ فُضِّلَ عَلَيْهِ فِي الْمَالِ وَالْخَلْقِ فَلْيَنْظُرْ إِلَى مَنْ هُوَ أَسْفَلَ مِنْهُ

আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের কারো দৃষ্টি যদি এমন লোকের উপর পড়ে, যাকে তার চেয়ে অধিক সম্পদ ও সৌন্দর্য দেওয়া হয়েছে, তবে সে যেন এমন লোকের প্রতি দৃষ্টি দেয় যে তার চেয়ে নিম্নস্তরে রয়েছে।”

মানুষ যদি স্বাস্থ্য, সম্পদ ও পদমর্যাদার ব্যাপারে তার চেয়ে দুর্বলদের দিকে লক্ষ করে তাহলে আল্লাহ যে তাকে কত ধরনের নিয়ামত দিয়েছে তা সে অনুভব করতে পারবে। ফলে সে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হবে। অপরপক্ষে মানুষ যদি উপরের দিকে তাকায়, তাহলে সে দেখবে আমার চেয়ে অমুকের সম্পদ অনেক বেশি, ফলে সে আফসোস করবে এবং আল্লাহর অকৃতজ্ঞ বান্দায় পরিণত হবে। এ ধরনের মানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্যই রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “দুই উপত্যকা পরিমাণ মাল থাকলেও সে তৃতীয়টির আকাঙ্ক্ষা করবে।” (সহিহ আল-বুখারি ৬৪৩৬)

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ لَمْ يَشْكُرِ النَّاسَ لَمْ يَشْكُرِ اللَّهَ

আবু সাইদ ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয়, সে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ নয়।”

জামি আত-তিরমিজি ১৯৫৫-এর বর্ণনায়: সেই ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ।

সুনান আবু দাউদ ৪৮১৩-এর বর্ণনা থেকে: যে ব্যক্তি উপকারকারীর গুণগান করল, সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল। আর যে উপকারকারীর উপকারের কথা গোপন করল, সে অকৃতজ্ঞ। অন্য বর্ণনায় (সুনান আবু দাউদ ১৬৭২): যদি কেউ তোমাদের কোনো উপকার করে তবে তাকে প্রতিদান দিবে। প্রতিদান দিতে না পারলে তার জন্য এমনভাবে দোয়া করবে যেন তোমরা অনুভব করো যে, তোমরা তার প্রতিদান দিয়েছো।

রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কেউ কারো উপকার করলে সে যদি উপকারকারীকে جَزَاكَ اللَّهُ خَيْرًا (আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান প্রদান করুন) বলে কৃতজ্ঞতা জানায়, তাহলে তা সর্বোত্তম প্রশংসা করা হবে।”১ (রাহে বেলায়াত, পৃষ্ঠা ৫৮৯)

কোনো অমুসলিম কাফির কোনো উপকার করলে রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন, প্রশংসা করতেন এবং তাকে যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে স্মরণ করতেন। (খুতবাতুল ইসলাম, পৃষ্ঠা ৩৫৪)

“নেককার লোকেরা বলে, আমরা তোমাদেরকে (এতিম-মিসকিনদেরকে) কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই খাওয়াচ্ছি। আমরা তোমাদের নিকট থেকে কোনো প্রতিদানও চাই না, কোনো কৃতজ্ঞতাও চাই না।” (সুরা আল-ইনসান ৭৬:৯)

ইসলামের বিধান লক্ষ করুন: একদিকে যে ব্যক্তি উপকার পেল তাকে বলা হচ্ছে, দিলকে বড় করো, যে ব্যক্তি তোমার উপকার করল তাকে সামর্থ্য থাকলে প্রতিদান দাও এবং এজন্য তার গুনগান করো। অপরদিকে যে ব্যক্তি উপকার করল তাকে বলা হলো, তুমি মানুষের উপকার করবে নিঃস্বার্থভাবে আল্লাহর জন্য, পরকালে পুরস্কারের আশায়।


  1. জামি আত-তিরমিজি ২০৩৫↩︎

বিষয়বস্তুতে যান

যোগাযোগ

মতামত, সংশোধনী বা যে কোনো পরামর্শ জানাতে এই ফর্মটি ব্যবহার করুন।