আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “সম্পদ বেশি হলে ধনী হয় না বরং প্রকৃত ধনী সে-ই যার অন্তর ধনী।”
অনেক সম্পদের অধিকারী হয়েও যে আরও চায় সে অভাবী। আর আল্লাহ কাউকে যা দিয়েছেন তাতেই যে সন্তুষ্ট থাকে, সে-ই ধনী।
আবু মুসা আশআরি ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যখন কোনো বান্দার পুত্রের মৃত্যু হয় তখন মহান আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে বলেন: তোমরা কি আমার বান্দার পুত্রের জান কবজ করেছ? ফেরেশতারা বলে, হ্যাঁ। অতঃপর আল্লাহ বলেন: তোমরা কি তার হৃদয়ের ফল কেড়ে নিয়েছ? তারা বলে, হ্যাঁ। আল্লাহ বলেন: আমার বান্দা কী বলল? তারা বলে, সে আপনার প্রশংসা করল এবং ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন বলল। মহান আল্লাহ বলেন: আমার বান্দার জন্য জান্নাতে একটি ঘর বানাও এবং তার নাম রাখো ‘বায়তুল হামদ’ (প্রশংসার ঘর)।”
সহিহ আল-বুখারি ৬৪২৪ থেকে: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি যখন আমার মুমিন বান্দার কোনো প্রিয় বস্তু (প্রিয়জন)-কে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নেই আর সে ধৈর্য ধারণ করে। আমার কাছে তার জন্য জান্নাত ছাড়া অন্য কিছু (প্রতিদান) নেই।’”
আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “দুজন স্ত্রীলোকের সাথে তাদের দুটো ছেলে ছিল। বাঘ এসে তাদের একজনের ছেলেকে নিয়ে গেল। এক মহিলা তার সঙ্গিনীকে বলল: বাঘ তোমার ছেলেকে নিয়ে গেছে। অন্যজন বলল: বাঘ তোমার ছেলেকে নিয়ে গেছে। তারা দুজন দাউদ ﵇আলাইহিস সালাম-এর কাছে তাদের মামলা পেশ করল। তিনি বড় স্ত্রীলোকটির পক্ষে রায় দিলেন। তারপর তারা বেরিয়ে দাউদ ﵇আলাইহিস সালাম-এর ছেলে সুলাইমান ﵇আলাইহিস সালাম-এর কাছে গেল এবং দুজনেই তাঁকে তাদের ঘটনা বলল। তখন তিনি বললেন,আমার কাছে একটি ছুরি আনো, কেটে দুজনের মধ্যে ভাগ করে দিবো। তখন ছোট স্ত্রীলোকটি বলল: আপনি এমন করবেন না, আল্লাহ আপনার উপর দয়া করুন। এ ছেলেটি তারই। তখন তিনি ছেলেটি ছোট স্ত্রীলোকটির বলে রায় দিলেন।”
আয়িশা ﵂রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: এক দরিদ্র স্ত্রীলোক তার দুটি কন্যাসহ আমার কাছে আসলো। আমি তাকে খাওয়ার জন্য তিনটি খেজুর দিলাম। সে প্রত্যেক মেয়েকে একটি করে খেজুর দিল এবং একটি খেজুর নিজে খাওয়ার জন্য তার মুখের দিকে তুলল। কিন্তু এটিও তার মেয়েরা খেতে চাইলো। যে খেজুরটি সে নিজে খাওয়ার ইচ্ছা করেছিল সেটিও দুভাগে ভাগ করে মেয়ে দুটিকে দিল। (আয়িশা ﵂রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন) ব্যাপারটি আমাকে অবাক করল। সে যা করল আমি তা রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললাম। তিনি বললেন, “এর বিনিময়ে আল্লাহ তার জান্নাত ওয়াজিব করে দিয়েছেন অথবা তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়েছেন।”
আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক মহিলা রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল: আমার পিতামাতা আপনার জন্য কোরবান হোক। আমার (তালাকদাতা) স্বামী আমার পুত্রকে নিয়ে যেতে চায় আর ঐ পুত্র আমার উপকার করছে এবং আবু ইনাবার কূপ থেকে আমাকে পানি এনে পান করাচ্ছে। তারপর তার স্বামী এসে বলল: আমার পুত্রের ব্যাপারে কে আমার সাথে তর্ক করতে চায়? তখন নবি ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছেলেটিকে বললেন, “হে বৎস, এ তোমার পিতা আর এ তোমার মাতা, তোমার ইচ্ছা তুমি তাদের যে কোনো একজনের হাত ধরো।” বালকটি তার মায়ের হাত ধরল। ফলে তার মা তাকে নিয়ে চলে গেল।
আব্দুল্লাহ ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ কি নিজের মালের চেয়ে ওয়ারিশদের মালকে বেশি ভালোবাসে?” লোকেরা বলল: ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে নিজের মালের চেয়ে ওয়ারিশদের মাল বেশি ভালোবাসে। তিনি বললেন, “কোনো ব্যক্তি (আল্লাহর পথে) যা খরচ করবে তা-ই শুধু তার নিজের মাল, আর যা সে রেখে যাবে তা ওয়ারিশদের মাল।”
আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: এক ব্যক্তি বলল: ইয়া রাসুলাল্লাহ, অমুক মহিলা বেশি নামাজ পড়া, রোজা রাখা এবং দান-খয়রাত করার ব্যাপারে খ্যাতি লাভ করেছে। কিন্তু সে তার প্রতিবেশীকে নিজের মুখের দ্বারা কষ্ট দেয়। তিনি বললেন, “সে জাহান্নামি।” লোকটি বলল: ইয়া রাসুলাল্লাহ, অমুক (অপর এক) মহিলা যে কম (নফল) রোজা রাখে, কম দান করে এবং কম (নফল) নামাজ পড়ে বলে জনশ্রুতি আছে। তার দানের পরিমাণ হলো পনিরের টুকরা বিশেষ, কিন্তু সে নিজের মুখের দ্বারা তার প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না। তিনি বললেন, “সে জান্নাতি।”
আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। এক বেদুইন নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিকট এসে বলল, আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলে দিন, যা করলে আমি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবো। তিনি বললেন, “তুমি আল্লাহর ইবাদত করবে, তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না। ফরজ সালাত আদায় করবে, ফরজ যাকাত প্রদান করবে ও রমজান মাসে রোজা রাখবে।” সে বলল, যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ! আমি এর চেয়ে বেশি করবো না। যখন সে ফিরে যাচ্ছিল তখন নবি ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “যে ব্যক্তি কোনো জান্নাতি লোককে দেখে তৃপ্ত হতে চায়, সে যেন এই লোককে দেখে।”
উসামা ইবনে যায়িদ ইবনে হারিস ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুহাইনা গোত্রের হুরাকার বিরুদ্ধে আমাদের পাঠালেন। আমরা ভোরে সে কওমের উপর আক্রমণ করলাম এবং তাদের পরাজিত করলাম। আমি এবং একজন আনসার এক ব্যক্তির পিছু নিলাম। আমরা তাকে ঘিরে ফেললাম। তখন তার মুখে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ শুনে আনসার নিবৃত্ত হলো। কিন্তু বর্শার আঘাতে আমি তাকে মেরে ফেললাম। আমরা ফিরে আসলে ঘটনাটি নবি ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট পৌঁছলো। তিনি আমাকে ডেকে বললেন, “হে উসামা, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলার পরও তুমি তাকে হত্যা করেছো?” আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ, সে তো প্রাণ বাঁচানোর জন্য এ কথা বলেছিল। (অন্যত্র, তিনি রাগান্বিত হয়ে বললেন, “তুমি কি তার অন্তর ছিঁড়ে দেখেছো যে, সে প্রাণভয়ে বলেছিল?”) রাসুল ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার বললেন, “তুমি কি তাকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলার পরও হত্যা করেছ?” এভাবে রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা বারবার বলতে থাকলেন। এমনকি আমার মনে হলো, হায়! আজকের দিনের আগে যদি আমি ইসলাম গ্রহণ না করতাম!
সহিহ আল-বুখারি ৬৪২৩ থেকে: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় যে বান্দা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে এবং এ বিশ্বাস নিয়ে কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে। আল্লাহ তার জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম করে দিবেন।”
ইবনে আব্বাস ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: আমি নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, “যদি কোনো আদম সন্তানের দুইটি উপত্যকা (ময়দান) ভর্তি মাল থাকে তবে সে তৃতীয়টি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করবে। আর আদম সন্তানের পেট কেবল মাটি দ্বারাই ভরা সম্ভব। যে আল্লাহর কাছে তওবা করে আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন।”
আল্লাহ বলেন: ছেড়ে দাও ওদেরকে। ওরা নিতে থাক আর ভোগ করতে থাক। আর (মিথ্যা) আশা ওদের গাফিলতিতে ডুবিয়ে রাখুক। শীঘ্রই ওরা (আমলের খারাপ পরিণতি) জানতে পারবে। (আল-হিজর ১৫:৩)
ইবনে আব্বাস ﵄রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “পাঁচটির পূর্বে পাঁচটিকে মূল্যবান মনে করো। তোমার বার্ধক্য আসার পূর্বে তোমার যৌবনকে, তোমার অসুস্থতার পূর্বে তোমার সুস্থতাকে, তোমার দারিদ্রতার পূর্বে তোমার সচ্ছলতাকে, তোমার ব্যস্ততার পূর্বে তোমার অবসর সময়কে এবং তোমার মৃত্যুর পূর্বে তোমার জীবনকে।”
সহিহ আল-বুখারি ৬৪১২ থেকে: নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “এমন দুটি নিয়ামত আছে যে দুটিতে (অবহেলা করার দরূন) অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। একটি সুস্থতা, অপরটি অবসর।”
আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু এটি (হাদিসটি) নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছিয়ে বলেছেন, “যখন কোনো ব্যক্তি মারা যায় তখন ফেরেশতারা বলে, সে পরকালের জন্য অগ্রিম কী পাঠিয়েছে? আর আদম সন্তানেরা (ওয়ারিশগণ) বলে, সে কী রেখে গেল?”
আলি ইবনে আবু তালিব ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: দুনিয়া পিছন দিকে সরে যাচ্ছে এবং পরকাল সামনে এগিয়ে আসছে। এদের প্রত্যেকেরই সন্তানাদি আছে। অতএব তোমরা পরকালের সন্তান হয়ে যাও, দুনিয়ার সন্তান হয়ো না। কেননা আজ (এ দুনিয়ায়) আমল করার সুযোগ আছে, হিসেব নেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। কিন্তু আগামীকাল শুধু হিসেব হবে, আমল করার কোনো সুযোগ থাকবে না।