আব্দুর রহমান ইবনে আউফ ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আবু বকর জান্নাতি, উমর জান্নাতি, উসমান জান্নাতি, আলি জান্নাতি, তালহা জান্নাতি, জুবায়ের জান্নাতি, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ জান্নাতি, সাদ (বিন আবু ওয়াক্কাস) জান্নাতি, সাইদ (ইবনে যায়িদ) জান্নাতি এবং আবু উবাইদা বিন জাররাহ জান্নাতি।”
উল্লিখিত দশজন সাহাবিকে “আশারায়ে মুবাশশারা” বা “দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজন” বলা হয়। লক্ষ্য করার বিষয় এ দশজনের মধ্যে প্রথম চারজন ছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান। তালহা উহুদ যুদ্ধে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন, এজন্য তাকে “জীবন্ত শহিদ” বলা হয়। জুবায়ের রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর “হাওয়ারি” হওয়ার কারণে যুদ্ধের সময় নিজের জীবনের পরোয়া না করে শত্রুবাহিনী থেকে তথ্য সংগ্রহ করে রাসুল ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এনে দিতেন। আব্দুর রহমান ইবনে আউফ খুব ধনী ছিলেন এবং জিহাদে অঢেল সম্পদ দান করতেন। খুলাফায়ে রাশিদার সময় তিনি প্রধান নির্বাচন পরিচালক ছিলেন। সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস এবং আবু উবাইদা সেনাপতি ছিলেন। আবু উবায়দা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলা হয় আমিনুল উম্মাহ (উম্মতের বিশ্বস্ত ব্যক্তি)। সাইদ ইবনে যায়িদ দামেস্ক অভিযানে অংশগ্রহণ করেন এবং দামেস্ক বিজীত হলে সেনাপতি আবু উবাইদা তাকে দামেস্কের গভর্নর নিযুক্ত করেন। কিন্তু তিনি আবু উবাইদাকে লিখলেন, আপনারা জিহাদ করবেন আর আমি বঞ্চিত হবো, সেটা হয় না। আমার স্থলে অন্যকে নিযুক্ত করেন। সেনাপতি আবু উবাইদা বাধ্য হয়ে তার স্থলে অন্যকে গভর্নর নিযুক্ত করেন। এবং সাইদ ইবনে যায়িদ জিহাদের ময়দানে ফিরে গেলেন। উপরোক্ত দশজন সাহাবির দীনি কাজ পর্যালোচনা করলে আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইসলামের কোন ধরনের আমলের কারণে আল্লাহ তাঁদেরকে এ মর্যাদা দিয়েছিলেন।
আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: জিবরাইল ﵇আলাইহিস সালাম নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বললেন: ইয়া রাসুলাল্লাহ, ঐ যে খাদিজা একটি পাত্র নিয়ে আসছেন। ঐ পাত্রে তরকারি অথবা খাদ্যদ্রব্য অথবা পানীয় ছিল। যখন তিনি আপনার কাছে আসবেন তখন তাঁকে তার রবের পক্ষ থেকে এবং আমার পক্ষ থেকেও সালাম জানাবেন আর তাঁকে জান্নাতের একটি ভবনের সুসংবাদ দিবেন, যা মতি দিয়ে তৈরি, যার ভিতরদেশ ফাঁকা। সেখানে থাকবে না কোনো প্রকার শোরগোল, কোনো প্রকার দুঃখ-ক্লেশ।
সহিহ আল-বুখারি ৩৭৬৮ থেকে: আয়িশা ﵂রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “হে আয়িশা, ইনি জিবরাইল ﵇আলাইহিস সালাম, তিনি তোমাকে সালাম বলছেন।” তখন আমি বললাম, ওয়া আলাইহিস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। আপনি যা দেখছেন, আমি তা দেখি না। এ দ্বারা তিনি রাসুলুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বুঝিয়েছেন।
মিসওয়ার ইবনে মাখরামাহ ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “ফাতিমা আমার টুকরা। যে তাঁকে দুঃখ দেবে, সে যেন আমাকে দুঃখ দিল।”
সহিহ আল-বুখারি ৩৭৫৩ থেকে: নবি ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, “হাসান ও হুসাইন আমার নিকট দুনিয়ায় যেন দুটি ফুল।”
আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, আনসারগণ বললেন: আমাদের খেজুরের বাগানগুলো আমাদের এবং তাদের (মুহাজির ভাইদের) মাঝে বণ্টন করে দিন। তিনি বললেন, “না।” তখন আনসারগণ বললেন: আপনারা বাগানগুলো রক্ষণাবেক্ষণে সাহায্য করুন এবং ফসলের অংশীদার হয়ে যান। মুহাজিরগণ বললেন: আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম।
রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারগণের এক সম্মেলনে তাদের প্রশংসা করে বলেন, “আপনারা আপনাদের মুহাজির ভাইদের সাথে যে ব্যবহার করেছেন তা নিঃসন্দেহে অনন্য সাধারণ সাহসিকতার কাজ।” অতঃপর তিনি বললেন, “মহান আল্লাহ বনু নাযির-এর ধন-সম্পদ আপনাদের করতলগত করে দিয়েছেন। যদি আপনারা চান তবে আমি এই সম্পদ মুহাজির ও আনসার সবার মধ্যে বণ্টন করে দিবো এবং মুহাজিরগণ পূর্ববৎ আপনাদের গৃহেই বসবাস করবেন। পক্ষান্তরে আপনারা চাইলে কেবল গৃহহীন ও সহায়-সম্বলহীন মুহাজিরগণের মধ্যে বণ্টন করে দিবো এবং এরপর তারা আপনাদের গৃহ ত্যাগ করে নিজেদের আলাদা গৃহ নির্মাণ করে নিবেন।” এই বক্তৃতা শুনে আনসারগণের দুইজন প্রধান নেতা; খাজরাজ গোত্রের নেতা সাদ ইবনে উবাদা ও আউস গোত্রের নেতা সাদ ইবনে মুআজ ﵄রাদিয়াল্লাহু আনহুমা দণ্ডায়মান হয়ে আরজ করলেন: ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাদের অভিমত এই যে, এই ধন-সম্পদ আপনি সম্পূর্ণই কেবল মুহাজির ভাইদের মধ্যে বণ্টন করে দিন এবং তারা এরপরও পূর্ববৎ আমাদের গৃহে বসবাস করতে থাকুন। নেতাদ্বয়ের এই উক্তি শুনে উপস্থিত আনসারগণ সমস্বরে বলে উঠলেন, আমরা এই সিদ্ধান্তে সম্মত ও আনন্দিত। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল আনসার ও তাদের সন্তানগণকে দোয়া দিলেন, ধন-সম্পদ মুহাজিরগণের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন এবং আনসারগণের মধ্যে শুধু সহল ইবনে হানিফ এবং আবু দুজানা ﵄রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-কে অত্যধিক অভাবগ্রস্ততার কারণে অংশ দিলেন। (মা’আরেফুল কোরআন, সুরা আল-হাশরের ৯ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা)
এই ঘটনা মুহাজিরদের প্রতি আনসারদের ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা এবং ত্যাগের অতুলনীয় দৃষ্টান্ত। অপরদিকে ইসলাম গ্রহণের কারণে মক্কার কাফিরেরা মুহাজিরদের উপর অকথ্য নির্যাতন চালায়। শেষ পর্যন্ত তাঁরা মাতৃভূমি, ধন-সম্পদ, বাস্তু-ভিটা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য হন। মুহাজিরগণও ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা ও ইসলামের জন্য ত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
সাদ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: একদা আব্দুর রহমান ইবনে আউফ ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে খানা খেতে দেওয়া হলো। তখন তিনি (উহুদ যুদ্ধের কথা স্মরণ করে) বললেন: মুসআব ইবনে উমাইর শহিদ হলেন আর তিনি আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলেন অথচ তাঁর কাফনের জন্য একটি চাদর ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় নি। হামজাহ বা অপর এক ব্যক্তি শহিদ হলেন, তিনিও ছিলেন আমার চেয়েও শ্রেষ্ঠ অথচ তাঁর কাফনের জন্যও একটি চাদর ছাড়া কিছুই পাওয়া যায় নি। তাই আমার ভয় হয়, আমাদের নেক আমলের বিনিময় হয়তো আমাদেরকে এই দুনিয়ার জীবনেই দেওয়া হলো। এ বলে তিনি কাঁদতে লাগলেন (এমনকি খাদ্যও বর্জন করলেন)।