আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তোমরা কি জানো গীবত কাকে বলে?” সাহাবিগণ বললেন: আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, “তোমার ভাইয়ের এমন কিছু (দোষ) আলোচনা করা, যা সে অপছন্দ করে।” বলা হলো, যা কিছু বললাম আমার ভাইয়ের মধ্যে যদি সেগুলো থাকে তবে এ ব্যাপারে আপনার মত কী? তিনি বললেন, “তুমি যেসব দোষ বললে, তা যদি তার মধ্যে থাকে তবেই তো তার গীবত করলে। যদি তার মধ্যে সে দোষ না থাকে তবে তুমি তার প্রতি মিথ্যা অপবাদ দিলে।”
“আল্লাহ মন্দ কথা প্রকাশ করা পছন্দ করেন না। তবে কারো প্রতি জুলুম করা হলে তা আলাদা কথা। আল্লাহ শ্রবণকারী, বিজ্ঞ।” (সুরা আন-নিসা ৪:১৪৮)
এ আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, মাজলুম ব্যক্তি যদি অত্যাচারীর অন্যায়, অত্যাচারের ঘটনা লোকের কাছে প্রকাশ করে তবে তা হারাম গীবতের আওতায় পড়বে না। (মা’আরেফুল কোরআন, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৬৭৬)
আনাস ইবনে মালিক ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যখন আমাকে মিরাজে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তখন আমি কিছু লোকের সামনে দিয়ে চলছিলাম। তাদের নখগুলো ছিল তামার। তারা তাদের মুখমণ্ডল ও বক্ষদেশ খামচাচ্ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরাইল! এরা কারা? তিনি (জিবরাইল ﵇আলাইহিস সালাম) বললেন: এরা মানুষের গোশত খেতো (অর্থাৎ গীবত করতো) এবং তাদের মান-ইজ্জত নিয়ে খেল-তামাশা করতো।”
অপর এক হাদিসে বর্ণিত আছে, “গীবত জিনার চাইতে শক্ত গুনাহ।” সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন: সেটা কিরূপে? রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “এক ব্যক্তি জিনা করে খালেস তওবা করলে তার গুনাহ মাফ হয়ে যায়। কিন্তু যার গীবত করা হয়েছে সে মাফ না করলে গীবতকারীর গীবতের গুনাহ মাফ হবে না।” (মা’আরেফুল কোরআন, সুরা হুজুরাতের ব্যাখ্যা)
ত্রুটি সংশোধনের জন্য কোনো ব্যক্তির দোষ এমন ব্যক্তির কাছে বলা যে তা সংশোধন করানোর ক্ষমতা রাখে।
মুফতির নিকট মাসয়ালা জানতে গিয়ে প্রয়োজনে কোনো ব্যক্তির (সম্ভব হলে নাম উল্লেখ না করে) ত্রুটি বলা যায়।
কোনো ব্যক্তি কারো সাথে বিয়ে বা ব্যবসায়ের সম্পর্ক করতে চাইলে এবং তার সম্পর্কে অন্য ব্যক্তির কাছে পরামর্শ চাইলে তার দোষ-গুণ (যা সে জানে) স্পষ্টভাবে বলে দেবে (মনে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ না রেখে)।
যেসব লোক সমাজে প্রকাশ্যে পাপ কাজের প্রসার ঘটাচ্ছে তাদের দোষ-ত্রুটির তীব্র সমালোচনা করা জায়েজ।
চেনার জন্য কাউকে তার খারাপ উপনামে ডাকা জায়েজ (তাকে খাটো করার উদ্দেশ্যে নয়)।
হাদিসে১ গীবতের কাফফারা সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “নিশ্চয় গীবতের কাফফারা হলো, তুমি যার গীবত করছ তার জন্য মাগফিরাত চাইবে। আর দোয়া করবে এভাবে, হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে ও তাকে মাফ করে দাও।”
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আমার সাথিদের কেউ যেন অপর সাথি সম্পর্কে আমাকে (খারাপ) কিছু না বলে। আমি তোমাদের নিকট থেকে পাকসাফ মন নিয়ে আসা পছন্দ করি।”
“হে মুমিনগণ! খুব বেশি ধারণা করা থেকে বিরত থাকো। কেননা কোনো কোনো ধারণা পাপ। তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় খোঁজাখুঁজি কোরো না। আর তোমাদের কেউ যেন কারও গিবত না করে।” (সুরা আল-হুজুরাত ৪৯:১২)
উম্মুল মুমিনিন সাফিআ বিনতে হুয়াই ﵂রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন: নবি ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইতিকাফ করছিলেন। আমি এক রাতে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে ফিরে আসছিলাম। তিনিও আমাকে এগিয়ে দেয়ার জন্য সাথে আসছিলেন। ইতিমধ্যে দুজন আনসার ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। নবি ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখে তারা তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছিলেন। নবি ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন, “একটু দাঁড়াও।” এ হলো আমার স্ত্রী সাফিআ বিনতে হুয়াই। তারা বলে উঠল, সুবহানাল্লাহ, হে আল্লাহর রাসুল! (আপনি একি বললেন!) তিনি বললেন, “শয়তান আদম সন্তানের রক্ত নালিতে পর্যন্ত চলাচল করে। আমার আশঙ্কা হলো, হয়তো শয়তান তোমাদের মনে খারাপ ধারণা সৃষ্টি করে দেবে।” (সহিহ আল-বুখারি ৩২৮১)
আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতোটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা কিছু শুনে তা-ই বলে বেড়ায়।”
উকবা ইবনে আমের ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি কারো দোষ দেখল তারপর সে তা গোপন রাখল, তবে সে ঐ ব্যক্তির মতো যে জীবন্ত প্রোথিত মেয়েকে বাঁচালো।”
আয়িশা ﵂রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমরা মৃতদেরকে গালি দিও না। কেননা তারা যা কিছু করেছে তার ফলাফলের কাছে পৌঁছে গেছে।”
আবু দারদা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন। নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার কোনো ভাইয়ের অসাক্ষাতে তার সম্মানহানীকর বিষয়কে প্রতিহত করবে, মহান আল্লাহ তার মুখমণ্ডলকে কিয়ামতের দিন জাহান্নামের আগুন থেকে দূরে রাখবেন।”
রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “সিরকা (ভিনেগার) যেমন মধু নষ্ট করে দেয়, তেমনিভাবে অসৌজন্যমূলক আচরণ মানুষের নেক আমল নষ্ট করে দেয়।”২(খুতবাতুল ইসলাম, পৃষ্ঠা ৪০১)
মুফতি মুহাম্মদ শফী (2010). মা’আরেফুল কোরআন. ১ম বাংলা সংস্করণ. ঢাকা, বাংলাদেশ: মাকতাবাতুল আযহার.
আবুল আলা মওদুদী (1986). তাফহীমুল কুরআন. ১ম বাংলা সংস্করণ. ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার.