ইবনে উমর ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। আমির দায়িত্বশীল, একজন ব্যক্তি তার পরিবারের দায়িত্বশীল, একজন স্ত্রী তার স্বামীগৃহের ও সন্তানদের দায়িত্বশীল। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেক দায়িত্বশীলকে তার নিজ নিজ অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।”
ইবনে আব্বাস ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। নবি ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের কেউ তার স্ত্রীর সাথে মিলনের সময় যদি বলে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মা জান্নিবনাশ শায়তানা ওয়াজান্নিবিশ শায়তানা মা রাজাকতানা (হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে শয়তান থেকে দূরে রাখো এবং যা আমাদেরকে দান করবে তাকেও শয়তান থেকে দূরে রাখো)’ তাহলে এর ফলে তাদের কিসমতে যে সন্তান হবে শয়তান তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।”
আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আম্বিয়ায়ে কেরামদের মধ্য থেকে জনৈক নবি জিহাদের জন্য বের হলেন এবং নিজ জাতিকে বললেন: ঐ লোক যেন আমার সাথে না যায়, যে সদ্য বিয়ে করেছে এবং স্ত্রীর সাথে মিলিত হতে চাচ্ছে কিন্তু এখনও মিলিত হয় নি।”
সহিহ মুসলিম ১০০৬/৫৩ থেকে: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (যখন) বললেন, “তোমাদের স্ত্রীদের সাথে মিলনও নেকির কাজ।” (তখন) সাহাবিগণ বললেন: ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাদের কেউ যৌন আকাঙ্ক্ষা পূরণ করলে তাতেও নেকি হবে? তিনি বললেন, “আচ্ছা বলো তো, যদি কেউ হারাম উপায়ে যৌন আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে তবে তার গুনাহ হবে কিনা?”
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন। রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “হে আব্দুল্লাহ, আমাকে কি খবর দেওয়া হয় নি যে, তুমি দিনভর রোজা রাখো এবং রাতভর নামাজ পড়ো?” আমি বললাম, হাঁ, ইয়া রাসুলাল্লাহ! তিনি বললেন, “তুমি এরূপ কোরো না বরং রোজা রাখো আবার বিরতি দাও। রাতে নামাজ পড়ো আবার ঘুমাও। তোমার উপর তোমার শরীরের হক আছে, তোমার উপর তোমার চোখের হক আছে এবং তোমার উপর তোমার স্ত্রীরও হক আছে।”
নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালমান এবং আবু দারদা ﵄রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন করে দেন। এক সময় সালমান ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু আবু দারদা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে এসে (আবু দারদা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর স্ত্রী) উম্মে দারদা ﵂রাদিয়াল্লাহু আনহা-কে মলিন কাপড় পরিহিত দেখতে পান। তিনি এর কারণ জিজ্ঞেস করলে উম্মে দারদা ﵂রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন: আপনার ভাই আবু দারদার দুনিয়ার কোনো কিছুর প্রতি মোহ নেই। কিছুক্ষণ পর আবু দারদা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু আসলেন। অতঃপর তিনি সালমান ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর জন্য খাদ্য তৈরি করান এবং বলেন: খেয়ে নিন, আমি রোজা রেখেছি। সালমান ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন: আপনি না খেলে আমি খাবো না, তাই তিনি সাথে খেলেন। রাত হলে আবু দারদা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু নামাজ পড়তে গেলেন। সালমান ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন: এখন ঘুমান। আবু দারদা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু ঘুমিয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর আবু দারদা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু আবার নামাজে দাঁড়াতে গেলেন; সালমান ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন: ঘুমান। যখন রাতের শেষ ভাগ হলো, সালমান ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু আবু দারদা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বললেন: এখন উঠুন। এরপর দুজনেই নামাজ পড়লেন। পরে সালমান ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন: আপনার উপর আপনার রবের হক আছে, আপনার উপর আপনার নিজেরও হক আছে, আপনার উপর আপনার পরিবারের হক আছে। প্রত্যেক হকদারকে তার হক দিন। এরপর আবু দারদা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু নবি ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে ঘটনা বর্ণনা করলেন। তখন নবি ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “সালমান সঠিক কাজ করেছে।” (সহিহ আল-বুখারি ১৯৬৮)
আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “স্বামীর উপস্থিতিতে তার সম্মতি ছাড়া স্ত্রী নফল রোজা রাখবে না, রমজানের রোজা ছাড়া। আর তার উপস্থিতিতে তার অনুমতি ছাড়া কাউকে তার ঘরে আসার অনুমতি দিবে না। (স্বামীর অনুপস্থিতিতে মাহরাম ছাড়া অন্য কাউকে তার গৃহে প্রবেশের অনুমতি দিবে না)।”
একজন মহিলা রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল: ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি যখন নামাজ পড়ি তখন আমার স্বামী সাফওয়ান আমাকে মারধর করে। আমি রোজা রাখলে রোজা ভাঙতে বাধ্য করে। সূর্য ওঠার পূর্বে সে ফজরের নামাজ পড়ে না। রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফওয়ান ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি তাকে দীর্ঘ সুরা দ্বারা নামাজ পড়তে নিষেধ করি। আর সে প্রায়ই (নফল) রোজা রাখে। অথচ আমি একজন যুবক, ধৈর্যধারণ করতে পারি না। রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (মহিলাকে) বললেন, “সংক্ষিপ্ত সুরাই নামাজের জন্য যথেষ্ট। আর স্বামীর অনুমতি ছাড়া (নফল) রোজা রাখবে না।” সাফওয়ান ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু বলল, আমার পরিবারের লোকেরা সর্বদা (পানি সরবরাহের) কাজে ব্যস্ত থাকে। তাই সূর্যোদয়ের পূর্বে ঘুম থেকে জাগতে পারি না। তার কথা শুনে তিনি বললেন, “যখনই তুমি জাগ্রত হবে তখনই নামাজ পড়ে নিবে।” (সুনান আবু দাউদ ২৪৫৯)
আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যদি কোনো পুরুষ তার স্ত্রীকে একই বিছানায় শোয়ার জন্য ডাকে আর সে আসতে অস্বীকার করে, তাহলে সকাল পর্যন্ত ফেরেশতাগণ তার স্ত্রীর উপর লানত দিতে থাকে।”
আসমা ইবনে ইয়াযিদ আল আনসারি ﵂রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন: আমি কয়েকটি সমবয়সী মেয়ের সাথে ছিলাম। রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট দিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের সালাম দিলেন এবং বললেন, “তোমাদের কেউ দীর্ঘদিন পিতা-মাতার ঘরে অবস্থান করে। আল্লাহ তাকে স্বামীর মতো নিয়ামত দেন এবং তার ঔরসে তাকে সন্তান-সন্ততি দান করেন। এ সত্ত্বেও কখনো স্বামীর ব্যবহারে সামান্য আঘাত পেলেই অকৃতজ্ঞতার সুরে বলে, আমি কখনো তোমার কাছে ভালো কিছু পাই নি।” (আল-আদাবুল মুফরদ ১০৪৮)
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “দুনিয়া সম্পদে পরিপূর্ণ এবং দুনিয়ার মধ্যে উত্তম সম্পদ হলো চরিত্রবান নেককার স্ত্রী।”
দুটি ভিন্ন পরিবেশ থেকে আসা স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের মধ্যেই ভালো ও মন্দ দিক রয়েছে। উভয়েই ভালো আচরণের মাধ্যমে তাদের মন্দগুলো দূর করার চেষ্টা করবেন। তবে স্বামীর দায়িত্বের অন্যতম দিক হলো স্ত্রীর সাথে সর্বোচ্চ সুন্দর ও অমায়িক আচরণ করা। কেননা সকল মানুষের মধ্যে নিজের সর্বোচ্চ সদাচরণের হকদার নিজের স্ত্রী।
এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের সে ব্যক্তি-ই ভালো, যে তার স্ত্রীর কাছে ভালো আর আমি আমার স্ত্রীর কাছে ভালো।”১(খুতবাতুল ইসলাম, পৃষ্ঠা ২৬৫)
আবু হুরায়রা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে মহিলা (নিয়মিত) পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করবে, রমজান মাসে রোজা রাখবে, নিজের লজ্জাস্থানের হেফাজত করবে এবং স্বামীর অনুগত থাকবে, সে জান্নাতের যে কোনো দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে।”
আবু উমামা ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট সবচেয়ে হতভাগ্য ব্যক্তি হলো সে, যে অপরের দুনিয়া বানাতে নিজের আখিরাত ধ্বংস করে।”
কেউ তার বন্ধুদের হারাম উপার্জনে সহযোগিতা করল বা নিজে হারাম পথে উপার্জন করে পরিবারের দুনিয়ার জীবন চাকচিক্যময় করে দিল। এ সবই হলো অপরের দুনিয়া বানাতে নিজের পরকাল নষ্ট করা।
আব্দুল্লাহ ইবনে যামআ ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের কারো উচিত নয় যে, সে নিজ স্ত্রীকে দাসীর মত প্রহার করবে। তারপর দিন শেষে (অর্থাৎ রাতে) তার সাথে মিলিত হবে।”
মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কোনো মুমিন স্বামী তার মুমিনা স্ত্রীকে ঘৃণা করতে পারে না। যদি তার কোনো একটি স্বভাব পছন্দ না হয় তবে তার অন্যান্য স্বভাবগুলো তার কাছে ভালো লাগবে।”২
আল্লাহ সন্দেহকে হারাম করেছেন। স্বামীর জন্য স্ত্রীকে সন্দেহ করা হারাম। স্ত্রীর জন্য স্বামীকে সন্দেহ করা হারাম। (মিম্বারের আহ্বান, পৃষ্ঠা ১৭৮)
আবু সাইদ খুদরি ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সবচাইতে নিকৃষ্ট ঐ লোক যে তার স্ত্রীর সাথে শয্যা গ্রহণ করে এবং তার স্ত্রীও তার সাথে শয্যা গ্রহণ করে, তারপর তাদের গোপন কথা (মিলনের কথা) লোকদের কাছে প্রকাশ করে।”
আয়িশা ﵂রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হায়েজগ্রস্ত থাকা অবস্থায় (পানি) পান করতাম, অতঃপর নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পাত্রটি দিতাম, আর তিনি তাতে আমার মুখের জায়গায় মুখ রেখেই পান করতেন। আবার হায়েজগ্রস্ত থাকা অবস্থায় আমি কখনো হাড়ের গোশত খেতাম অতঃপর তা আমি নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দিতাম, আর তিনি আমার মুখের জায়গায় মুখ রেখে খেতেন।
আসওয়াদ ﵁রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি আয়িশা ﵂রাদিয়াল্লাহু আনহা-কে জিজ্ঞেস করলাম, নবি কারিম ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে থাকা অবস্থায় কী করতেন? তিনি বললেন: ঘরের কাজ-কর্মে ব্যস্ত থাকতেন অর্থাৎ পরিবার বর্গের সহায়তা করতেন। আর সালাতের সময় হলে সালাতের জন্য চলে যেতেন।
উম্মে আতিয়া ﵂রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺসল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কোনো মহিলা কোনো মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে তিন দিনের বেশি শোক পালন করতে পারবে না। তবে (মৃত) স্বামীর উদ্দেশ্যে চার মাস দশ দিন শোক পালন করবে। শোক পালনের সময় রঙিন চকমকে পোশাক পরবে না, সুরমা লাগাবে না ও সুগন্ধি ব্যবহার করবে না। কিন্তু (হায়েজ ইত্যাদি) থেকে পবিত্র হয়ে অল্প সুগন্ধি লাগাতে পারে। এ সময় গাছের ছালের রঙ করা কাপড় পরতে পারে।”